বাংলা নবাব

📚 বাংলার নবাব :

📑 মুর্শিদকুলি খান ( 1700-1727 খ্রিষ্টাব্দ ) :

🔹ঔরঙ্গজেব 1700 সালে মুর্শিদকুলিকে বাংলার দেওয়ান নিযুক্ত করেন । মুর্শিদাকুলি 1713 সালে বাংলার ডেপুটি গভর্নর ( নায়েব সুবেদার ) ও 1717 সালে গভর্নর বা সুবেদার হন । 1719 সালে তিনি ওড়িশারও সুবেদার নিযুক্ত হন । মুর্শিদকুলি সারা জীবন মুঘল কর্তৃত্ব স্বীকার করেছেন এবং রাজস্ব দিল্লিতে পাঠিয়েছেন ।

🔹তিনি রাজধানী ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরিত করেন । সব উর্বর জমি খালিসা ( বাজার জমি ) -তে পরিণত করে মুর্শিদকুলি সেগুলি বড়ো বড়াে জমিদারদের হাতে তুলে দেন । কিন্তু তিনি এইসব জমিদারদের কড়া নিয়ন্ত্রণে রাখতেন ।

🔹মুর্শিদকুলি হিন্দুদের উচ্চ রাজপদে নিয়ােগ করেন এবং অধিকাংশ বড়াে জমিদারও হিন্দু ছিলেন । তাঁর আমলে রাজস্ব প্রশাসন উন্নত হলেও সামরিক দিক থেকে দুর্বলতা ছিল । এই সময় ব্যবসাবাণিজ্যের উন্নতি হয় , 1717 সালের ফারুকশিয়ারের ফরমানের পরও তিনি বিদেশি বণিকদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন ।


📔 সুজা – উদ্ – দিন ( 1727-39 খ্রিষ্টাব্দ ) :

📑 মুর্শিদকুলির জামাই , সুজা একজন দক্ষ প্রশাসক ছিলেন । 1733 সালে মহম্মদ শাহ তাঁকে বিহারেরও সুবেদার নিযুক্ত করেন ।

📔 সরফরাজ খান ( 1739-40 খ্রিষ্টাব্দ ) :

📑 সুজার পুত্র সরফরাজকে হত্যা করে বিহারের নায়েব – সুবেদার আলিবর্দি খান বাংলার মসনদ দখল করেন ।

📔 আলিবর্দি খান ( 1740-1756 খ্রিষ্টাব্দ ) :

📑 আলিবর্দি ইংরেজ ও ফরাসি — উভয় পক্ষকেই নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করেছিলেন এবং ইংরেজদের কলকাতায় ও ফরাসিদের চন্দননগরে দুর্গ নির্মাণ করতে দেননি ।

📑 মারাঠা ( বগি ) আক্রমণে বহুদিন যাবৎ আলিবর্দি হয়রান ছিলেন । শেষে 1751 সালে উড়িষ্যার কিছুটা অংশ ছেড়ে দিয়ে এবং 12 লক্ষ টাকা দিয়ে মারাঠা আক্রমণের হাত থেকে রেহাই পান ।

📔 সিরাজ – উদ্ – দৌলা ( 1756-57 খ্রিষ্টাব্দ ) :

📑 আলিবর্দির মৃত্যুর পর ক্ষমতায় এসেই সিরাজ ইংরেজদের কলকাতায় নতুন নির্মিত দুর্গ প্রকার ভেঙে ফেলতে , সিংহাসনের জন্য তার প্রতিদ্বন্দ্বী সৌকত জঙ্গকে সমর্থন না করতে নির্দেশ দেন । নির্দেশ মানার পরিবর্তে সিরাজের দূতকে কলকাতায় অপমানিত করা হয় । সিরাজ তৎক্ষণাৎ কাশিমবাজার কুঠি ধ্বংস করেন এবং কলকাতা আক্রমণ করেন । সব ইংরেজরা ফলতায় পালিয়ে যায় । কলকাতা দখল করে সিরাজ নাম পালটে ‘ আলিনগর ’ নাম রাখেন এবং মাণিকৰ্চাদের দায়িত্ব কলকাতা ছেড়ে ফিরে যান ।

📑 কলকাতা আক্রমণের সময় একটি ছােটো ঘরে সিরাজ প্রায় 150 জন ইংরেজকে বন্দী করে রাখায় তারা দমবন্ধ হয়ে মারা যান বলে হলওয়েল নামক এক ইংরেজ অভিযােগ করেন । এই ঘটনাটি ‘ অন্ধকূপ হত্যা ’ নামে কুখ্যাত — কিন্তুু অধিকাংশ ঐতিহাসিক মনে করেন যে , এরকম কোনও ঘটনা ঘটেনি ।

📑 মাদ্রাজ থেকে ক্লাইভ ও ওয়াটসনের নেতৃত্ব অতিরিক্ত বাহিনী আসার পরে ইংরেজরা সহজেই কলকাতা পুনর্দখল করে । সিরাজ ইংরেজদের সঙ্গে আলিনগরের চুক্তি ( 9 ফেব্রুয়ারি , 1757 সাল ) স্বাক্ষরে বাধ্য হন ।

📑 ইতিমধ্যে মুর্শিদাবাদ দরবারে সিরাজের বিরুদ্ধে চক্রান্ত গড়ে ওঠে মীরজাফর , ঘসেটি বেগম , রাজা রাজবল্লভ , রায়দুর্লভ , উমিচাঁদ ইত্যাদির নেতৃত্বে । এদের পেছনে ছিল জগৎ শেঠের সমর্থন । ইংরেজরাও ক্লাইভের নেতৃত্বে এই চক্রান্তে সামিল হয় । 23 জুন , 1757 সালে নদীয়ার পলাশির প্রান্তরে ইংরেজ বাহিনীর মুখােমুখি হয়ে শুধুমাত্র দুই সেনাপতি মীরমদন ও মােহনলাল নবাবের হয়ে যুদ্ধ করেন । প্রধান সেনাপতি মীরজাফর – সহ অন্য সেনাপতিরা নিষ্ক্রিয় থাকেন । এই দুই সেনাপতি ও অল্পসংখ্যক ফরাসিদের বীরত্বপূর্ণ লড়াই সত্ত্বেও ক্লাইভের নেতৃত্বে ইংরেজরা সহজেই জয়ী হয় ।

📑 সামরিক দিক থেকে পলাশি ছিল একদিনের সামান্য সংঘর্ষ কিন্তুু ঐতিহাসিক দিক থেকে এটি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিজয় — এই বিজয়ের মধ্যে দিয়েই ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের সূচনা হয় । সিরাজ পালিয়ে গেলেও শীঘ্রই ধরা পড়েন এবং মীরজাফরের পুত্র মীরন তাঁকে হত্যা করেন ।

📔 মীরজাফর ( 1757-60 খ্রিষ্টাব্দ ) :

📑 নবাব হয়েই মীরজাফর ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা , বিহার এবং উড়িষ্যায় কোনও কর না দিয়েই বাণিজ্য চালানাের অধিকার দেন । তিনি কোম্পানিকে এবং কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের প্রচুর পরিমাণ অর্থ প্রদান করেন ।

📑 অতিরিক্ত অর্থ প্রদানে মীরজাফর অসমর্থ হওয়ায় এবং ওলন্দাজদের সঙ্গে ঘনিষ্ট হওয়ার চেষ্টা করায় মীরজাফরকে পদচ্যুত করা হয় এবং বিদারার যুদ্ধে ইংরেজরা ওলন্দাজদের পরাজিত করে ( 1759 খ্রিষ্টাব্দ ) ।

📔 মীরকাশিম ( 1759 খ্রিষ্টাব্দ ) :

📑 মীরজাফরের জায়গায় নবাব হন তার জামাই মীরকাশিম । রাজত্বের শুরুতেই তিনি বর্ধমান , মেদিনীপুর ও চট্টগ্রাম কোম্পানিকে ছেড়ে দেন । তাছাড়া প্রচুর পরিমাণ অর্থও দেন । মীরকাশিম দক্ষ প্রশাসক ছিলেন । তিনি প্রশাসন ও সামরিক ব্যবস্থার সংস্কারের চেষ্টা করেন । ই রেজদের সমান বাণিজ্যিক সুবিধা ভারতীয় বণিকদেরও দেন । ইংরেজদের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়ানাের জন্য তিনি রাজধানী মুঙ্গেরে সরিয়ে নিয়ে যান ।

📑 ইংরেজদের সঙ্গে একাধিক সংঘর্ষের পরে বক্সারের যুদ্ধে মীরকাশিম , অবধের নবাব সুজা – উদ্ – দৌলা ও মুঘল সম্রাট শাহ আলমের মিলিত বাহিনী ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয় । মীরকাশিম পালিয়ে যান । সুজা এলাহাবাদ ও কারা ছেড়ে দিতে এবং বিপুল ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য হন । এলাহাবাদের চুক্তি অনুযায়ী শাহ আলম বাংলা , বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি ইংরেজদের দিয়ে দেন এবং ব্রিটিশ পেনশনভােগীতে পর্যবসিত হন ।

📑 বাংলায় মীরজাফরকে 1763 সালে পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয় কিন্তুু 1765 সালে তিনি মারা যান । এরপর নাজম – উদ্ – দৌলা নবাব হন । 1765 -1772 সাল পর্যন্ত ‘ দ্বৈত শাসনব্যবস্থা ’ চলেছিল — নামে বাংলা শাসনের দায়িত্ব ছিল নবাবের কিন্তুু আসল ক্ষমতা ছিল ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানির হাতে । এই সময়ে বাংলাদেশের অবস্থার চূড়ান্ত অবনতি হয় এবং 1770 সালের মন্বন্তরে সমগ্র প্রদেশ আক্ষরিক অর্থেই শ্মশানে পরিণত হয় । 1772 সালে ইস্ট ইণ্ডিয়া কোম্পানি সরাসরি বংলার শাসনভার গ্রহণ করে এবং বাংলার নবাবেরা কোম্পানির পেনশনভােগীতে পর্যবসিত হন ।

Related posts:

পদার্থ কাকে বলে ? পদার্থ ও বস্তু কি এক ?
প্রশ্ন : মূল্যায়ন কাকে বলে ? মূল্যায়ন কয় প্রকার ও কী কী ? যে - কোনো একপ্রকার মূল্যায়নের বিবরণ দি...
একক পাঠ পরিকল্পনা কাকে বলে ? পাঠ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা লিখুন । এর সুবিধা লিখুন ।
শিক্ষা পরিকল্পনা কাকে বলে ? শিক্ষা পরিকল্পনার শ্রেণিবিভাগ করুন । যেকোনো একপ্রকার পরিকল্পনার বিবরণ দি...
ধারণা মানচিত্র কাকে বলে ? এর বৈশিষ্ট্য লিখুন । বাস্তবায়নের উপায় লিখুন । এর গুরুত্ব লিখুন ।
পাঠ একক বিশ্লেষণ কাকে বলে ? পাঠ একক বিশ্লেষণের স্তর বা ধাপগুলি লিখুন
অন্তর্ভুক্তিকরণে ( সমন্বিত শিখনে ) প্রদর্শিত শিল্পকলার কীভাবে প্রয়োগ করবেন
প্রদর্শিত শিল্পকলার লক্ষ্য , বৈশিষ্ট্য , গুরুত্ব ও বাস্তবায়নের কৌশল
প্রাথমিক স্তরে পাঠদানের ক্ষেত্রে নাটকের ব্যবহার
মূল্যবোধ শিক্ষায় বিদ্যালয় ও শিক্ষকের ভূমিকা
মূল্যবোধ || মূল্যবোধের বৈশিষ্ট্য || প্রাথমিক স্তরে মূল্যবোধের শিক্ষার গুরুত্ব
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষায় তথ্য ও সংযোগসাধন প্রযুক্তির ভূমিকা
সমন্বয়িত শিক্ষণে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সমস্যা ও সাফল্য
পাঠক্রম পরিব্যাপ্ত শিক্ষণবিজ্ঞানে তথ্য ও সংযোগসাধন প্রযুক্তির ব্যবহার
পাঠক্রম পরিব্যাপ্ত শিক্ষণবিজ্ঞানে তথ্য ও সংযোগসাধন প্রযুক্তির ব্যবহার
উদাহরণসহ প্রকল্প পদ্ধতির বিবরণ
পূর্বসূত্রজনিত শিখন ( Contextualization ) কাকে বলে ?
জ্ঞান , পাঠক্রম , পাঠ্যবই , শিক্ষার্থী ও শিক্ষণবিজ্ঞানের মধ্যের সম্পর্ক
অনুসন্ধান পদ্ধতি
জ্ঞান নির্মাণ কীভাবে হয় উদাহরণসহ আলোচনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page