ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়

” ছেলেটির বাবা ছিলেন ডেপুটি ম্যাজিস্টেট । আদতে চব্বিশ পরগণা জেলার টাকী শ্রীপুরে তার আদি নিবাস হলেও কর্মসূত্রে তিনি তখন ছিলেন বিহারের পাটনা শহরের বাকিপুরে । সেখানে এই ছেলেটির জন্ম । 

 

 

বি . এ . পাশ করে ছেলেটি কলকাতায় চলে এসে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে । চিকিৎসাবিদ্যা শিক্ষার জন্য ছেলেটি মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হয় এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের এল , এম . এস . এবং এম . ডি . ( ১৯০৮ খ্রিঃ ) উপাধি লাভ করে । 

 

 

সে সময় দেশে ভাল ডাক্তার ছিল না । পরাধীন দেশে শ্বেতাঙ্গ চিকিৎসকদের কাছে । কজন চিকিৎসার জন্য যেতে পারত ! এই অবস্থা ছেলেটিকে খুব পীড়িত করত । তাই সেই ছেলেটি উচ্চতর শিক্ষা লাভ করে একজন বড়াে ডাক্তার হওয়ার ইচ্ছায় বিলাত যাত্রা করে । বিলাতে দু’বছর থেকে এম . আর . সি . পি . এবং এম . আর . সি . এস . এবং পরে এফ . আর . সি . এস . উপাধি লাভ করে ।

 

 

এখনকার যে নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজ , সেটির তখন নাম ছিল । ক্যাম্বেল মেডিক্যাল স্কুল । বিলাত থেকে ফিরে ছেলেটি সেখানে চিকিৎসক হিসাবে যােগ দেয় । সেই সঙ্গে নিজেও নিজের বাসভবনে চিকিৎসা ব্যবসা শুরু করে । ছেলেটির মেধা ও বিচক্ষণতার খ্যাতি অল্পদিনে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে । একসময় ছেলেটি হয়ে ওঠে দেশের সেরা চিকিৎসক শুধু নয় , সাক্ষাৎ ধন্বন্তরী বলে পরিচিতি লাভ করে । ফলে , দূরদূরান্ত থেকে রােগীরা তার চিকিৎসা নিতে ছুটে আসতেন । 

 

 

পশ্চিমবঙ্গের এক মফস্বল এলাকার এক মহিলা দীর্ঘদিন থেকে মাথার যন্ত্রণায় ভুগছেন । দেশের বহু নামী ডাক্তার দেখিয়ে নানা ওষুধপত্র খেয়ে যখন কিছুতেই সেই যন্ত্রণার উপশম হচ্ছিল না , সেই সময় সেই মহিলার স্বামী তাকে দেখাতে নিয়ে আসেন এই ধন্বতরী চিকিৎসকের কাছে । প্রতিদিন এই ডাক্তার কিছু সময় বিনা পারিশ্রমিকে বাড়িতে সকালবেলায় রােগী দেখত । ঘরের এক প্রান্তে তার বসার চেয়ার । দরজা দিয়ে ঢুকে রােগীকে হেঁটে ডাক্তারবাবুর সামনে গিয়ে বসতে হত । ডাক্তারবাবু রােগীকে সেই সময়টুকুতে তার দক্ষতা দিয়ে রােগ নির্ণয় করে উঠতে সক্ষম হত । রােগীর দেহের লক্ষণ , চলাফেরা ও চেহারা দেখেই রােগের উপসর্গের কথা বলে দিতে পারত । সেই মহিলা একসময় তার স্বামীর সঙ্গে গিয়ে ঘরে ঢুকে ধীর পায়ে হেঁটে সেই ডাক্তারবাবুর সামনে গিয়ে বসলেন । ডাক্তারবাবুও তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকে লক্ষ করে যা বােঝার বুঝে ফেলে । মৃদু হেসে জানাল , সব সময় মাথার যন্ত্রণায় কষ্ট পান ? আলাের দিকে তাকাতে কষ্ট ? 

 

 

এসব কথা শুনে ভদ্রমহিল আশ্চর্য হয়ে যান । তাঁর মুখে যন্ত্রণার ভেতরেও হাসি ফুটে ওঠে । তিনি স্বীকার করেন , সবই ঠিক । ডাক্তারবাবু জানায় , আপনার মাথার যন্ত্রণা সারাতে কোনাে ওষুধের প্রয়ােজন নেই । কেবল সিঁদুরটা পালটাবেন , যে ব্রান্ডের সিঁদুর ব্যবহার করেন , তার পরিবর্তে বাজারের অন্য কোনাে ভাল সিঁদুর পরবেন । 

 

 

কে.এই ছেলেটি ? কে এমন বিচক্ষণ ডাক্তার ? রােগীর চলাফেরা দেখে রােগ নির্ণয় করতে পারঙ্গম হত ? ছেলেটির নাম বিধানচন্দ্র রায় । ধন্বন্তরী চিকিৎসক ডাঃ বিধানচন্দ্র রায় । তার সময়ে ভারতের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক হিসাবে দেশে বিদেশে যিনি খ্যাতি লাভ করেছিলেন । তার আর এক পরিচয় , তিনি ছিলেন একদা পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের রূপকার । স্বাধীনতার লাভের পর তার চেষ্টাতেই পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্নমুখী উন্নয়নের সূচনা এবং তাঁরই পরিকল্পিত পথেই এখনাে পশ্চিমবঙ্গের অগ্রগতি অব্যাহত ।

 

 

ডাঃ বিধানচন্দ্র রায়ের জন্ম ১ লা জুলাই ১৮৮২ খ্রিস্টাব্দ । তার পিতার নাম প্রকাশচন্দ্র রায় । মাতার নাম অঘােরকামিনী দেবী ।

 

 অল্পদিনেই তার খ্যাতি সুচিকিৎসক হিসাবে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে । এর ভেতর তিনি জড়িয়ে পড়েন দেশের সমাজ জীবনের সঙ্গে । ফলে ১৯১৬ খ্রিঃ বিধানচন্দ্র কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেনেটের সদস্য নির্বাচিত হন । দু’বছর পর তিনি ক্যাম্বেলের সরকারী চাকরি ছেড়ে দিয়ে যােগদান করেন মেডিসিনের অধ্যাপক পদে কারমাইকেল মেডিক্যাল কলেজে । বর্তমানে সেই মেডিক্যাল কলেজের নাম — আর . জি . কর মেডিক্যাল কলেজ । 

 

 

বিধানচন্দ্র এর ভেতর জড়িয়ে পড়েন দেশের রাজনীতির সঙ্গে । ভারতবর্ষে স্বাধীনতার আন্দোলন তখন উত্তাল হয়ে উঠেছে । দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ ততদিনে কংগ্রেসের বাইরে প্রতিষ্ঠা করেছেন স্বরাজ্যদল । সেই স্বরাজ্যদলের হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তিনি বাংলার ব্যবস্থাপক সভার সদস্য নির্বাচিত হলেন । তারপর কলকাতা কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক ( ১৯২৮ খ্রিঃ ) এবং কলকাতা কর্পোরেশনের মেয়র হলেন ( ১৯৩১-৩২ খ্রিঃ ) । একদিকে তিনি রাজনীতি এবং অন্যদিকে চিকিৎসক হিসাবে সমাজের মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা তিনি দৃঢ় ভাবে ধরে রেখেছিলেন ।

 

 

বিধানচন্দ্র কংগ্রেস প্রার্থী রূপে আইন সভার সদস্য নির্বাচিত হয়ে ১৯৪৮ খ্রিঃ ২৩ শে জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হন । তার কর্মময় নতুন জীবন । প্রখ্যাত চিকিৎসক ও রাজনীতিজ্ঞ বিধানচন্দ্র হলেন পশ্চিমবঙ্গের কর্ণধার । আমৃত্যু সেই গুরু দায়িত্ব তিনি পালন করে গেছেন । ১৯৪৮ খ্রিঃ থেকে ১৯৬২ খ্রিঃ পর্যন্ত সুদীর্ঘ চোদ্দ বছর তিনি একটানা মুখ্যমন্ত্রীর পদে আসীন ছিলেন । 

 

 

আধুনিক পশ্চিমবঙ্গের রূপকার ও দেশের সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসক বিধানচন্দ্র রায়ের তিরােধান ঘটে ১৯৬২ খ্রিঃ ১ লা জুলাই । 

 

 

 

❤ ‘ তিনি বঙ্গের বিশ্বকর্মা ছিলেন ।’

 

                             — কালীকিঙ্কর সেনগুপ্ত”

Related posts:

পদার্থ কাকে বলে ? পদার্থ ও বস্তু কি এক ?
প্রশ্ন : মূল্যায়ন কাকে বলে ? মূল্যায়ন কয় প্রকার ও কী কী ? যে - কোনো একপ্রকার মূল্যায়নের বিবরণ দি...
একক পাঠ পরিকল্পনা কাকে বলে ? পাঠ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা লিখুন । এর সুবিধা লিখুন ।
শিক্ষা পরিকল্পনা কাকে বলে ? শিক্ষা পরিকল্পনার শ্রেণিবিভাগ করুন । যেকোনো একপ্রকার পরিকল্পনার বিবরণ দি...
ধারণা মানচিত্র কাকে বলে ? এর বৈশিষ্ট্য লিখুন । বাস্তবায়নের উপায় লিখুন । এর গুরুত্ব লিখুন ।
পাঠ একক বিশ্লেষণ কাকে বলে ? পাঠ একক বিশ্লেষণের স্তর বা ধাপগুলি লিখুন
অন্তর্ভুক্তিকরণে ( সমন্বিত শিখনে ) প্রদর্শিত শিল্পকলার কীভাবে প্রয়োগ করবেন
প্রদর্শিত শিল্পকলার লক্ষ্য , বৈশিষ্ট্য , গুরুত্ব ও বাস্তবায়নের কৌশল
প্রাথমিক স্তরে পাঠদানের ক্ষেত্রে নাটকের ব্যবহার
মূল্যবোধ শিক্ষায় বিদ্যালয় ও শিক্ষকের ভূমিকা
মূল্যবোধ || মূল্যবোধের বৈশিষ্ট্য || প্রাথমিক স্তরে মূল্যবোধের শিক্ষার গুরুত্ব
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষায় তথ্য ও সংযোগসাধন প্রযুক্তির ভূমিকা
সমন্বয়িত শিক্ষণে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সমস্যা ও সাফল্য
পাঠক্রম পরিব্যাপ্ত শিক্ষণবিজ্ঞানে তথ্য ও সংযোগসাধন প্রযুক্তির ব্যবহার
পাঠক্রম পরিব্যাপ্ত শিক্ষণবিজ্ঞানে তথ্য ও সংযোগসাধন প্রযুক্তির ব্যবহার
উদাহরণসহ প্রকল্প পদ্ধতির বিবরণ
পূর্বসূত্রজনিত শিখন ( Contextualization ) কাকে বলে ?
জ্ঞান , পাঠক্রম , পাঠ্যবই , শিক্ষার্থী ও শিক্ষণবিজ্ঞানের মধ্যের সম্পর্ক
অনুসন্ধান পদ্ধতি
জ্ঞান নির্মাণ কীভাবে হয় উদাহরণসহ আলোচনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page