বাংলা সাহিত্য – কামিনী রায়

“💠 কামিনী রায় 💠

✅ কামিনী রায় একজন প্রথিতযশা বাঙালি কবি, সমাজকর্মী এবং নারীবাদী লেখিকা যিনি ব্রিটিশ ভারতের প্রথম মহিলা স্নাতক ছিলেন।

✅ ১৮৬৪ সালের ১২ অক্টোবর অবিভক্ত বাংলার বরিশালের বাসণ্ডা গ্রামে কামিনী রায়ের জন্ম হয়৷ তাঁর প্রকৃত নাম কামিনী সেন। তাঁর বাবা চণ্ডীচরণ সেন একজন ব্রাহ্মধর্মাবলম্বী, বিচারক ও ঐতিহাসিক লেখক ছিলেন৷ কামিনী রায়ের মায়ের নাম বামাসুন্দরী দেবী। কামিনী রায়ের ঠাকুরদা নিমচাঁদ সেন ছিলেন ধার্মিক প্রকৃতির লোক। ছোট বয়স থেকেই কামিনী ঠাকুরদার কাছে শেখা সংস্কৃত শ্লোক যা তাঁর শিশুমনকে প্রভাবিত করেছিল সেগুলি পাঠ ও আবৃত্তি করে শোনাতেন৷ ক্রমশ সংস্কৃত ও বাংলা সাহিত্যের প্রতি আলাদা একটি অনুরাগ তাঁর তৈরি হতে থাকে সেই সময় থেকে। ১৮৯৪ সালে কামিনী রায়ের সাথে কেদারনাথ রায়ের বিয়ে হয়।

✅ কামিনী রায়ের প্রাথমিক পড়াশুনা তাঁর মায়ের কাছেই শুরু হয়। বাড়িতেই তিনি বর্ণপরিচয় প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ এবং শিশুশিক্ষা শেষ করে নয় বছর বয়সে স্কুলে ভর্তি হন এবং ওই বছরই আপার প্রাইমারি পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে প্রথম স্থান অর্জন করেন। ১৮৮০ সালে তিনি এন্ট্রান্স পরীক্ষা ও ১৮৮৩ সালে এফ এ বা ফার্স্ট আর্টস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। বেথুন কলেজ থেকে তিনি ১৮৮৬ সালে দেশের প্রথম মহিলা হিসাবে সংস্কৃত ভাষায় সম্মানসহ স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তাঁর বাবা তাঁকে বলেছিলেন,’চাকরি নয় জ্ঞান বৃদ্ধির জন্যই আমি তোমাকে পড়াশোনা করিয়েছি।’ বাবার এই কথাই পরবর্তীকালে কামিনী রায়ের জীবন বদলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছিল । শিক্ষার মাধ্যমে জ্ঞান বাড়িয়ে তা সমাজের উন্নতির জন্য ব্যবহার করাকেই জীবনের ব্রত বানিয়ে ছিলেন কামিনী রায়।

✅ কামিনী রায় পড়াশুনা শেষ করে বেথুন কলেজেই শিক্ষকতা শুরু করেন এবং পরে অধ্যাপক হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। তবে কামিনী রায়ের কবিসত্তার পরিচয় পাওয়া গেছিল খুব কম বয়স থেকেই। বিয়ের পর শুরুর কয়েক বছর তিনি সংসার করতেই ব্যস্ত ছিলেন। সেইময়ে মাত্র একটি কবিতার বই প্রকাশ হয়েছিল তাঁর। কিন্তু ১৯০০ সালে আচমকা তাঁর এক সন্তানের মৃত্যু হয়। ১৯০৮ সালে মারা যান তাঁর স্বামীও। আর ১৯২০ সালে মৃত্যু হয় তাঁর বাকি দুই ছেলেমেয়েরও। পরপর আসা এই আঘাতগুলি চূর্ণবিচূর্ণ করে দিয়েছিল তাঁর হৃদয়কে। শোকে মূহ্যমান হয়ে কিছুদিন কাটানোর পর কাব্যচর্চায় মন দেন তিনি৷ ১৮৮৯ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘আলো ও ছায়া’ প্রকাশিত হয়। বইটির ভূমিকা লিখেছিলেন হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। এটির প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয় ১৮৯৯ সালে এবং অষ্টম সংস্করণ বের হয় ১৯২৫-এ। সেই সময় নারীশিক্ষার না থাকায় বইটিতে লেখিকা হিসেবে কামিনী রায়ের নাম প্রকাশিত হয়নি। তবে মুখে মুখে তাঁর কবিখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে অল্প সময়ের মধ্যেই। রবীন্দ্রনাথকেই গুরুর আসন দিয়েছিলেন কামিনী রায়। রবীন্দ্রনাথ তাঁর একাধিক কাব্যগ্রন্থ নিয়ে আলোচনাও করেছেন। কামিনী রায় নারীবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। তাঁর অনেক প্রবন্ধেও এর প্রতিফলন ঘটেছে। তিনি নারী শ্রমতদন্ত কমিশনেরও সদস্যা ছিলেন।

✅ কামিনী রায়ের উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে-
‘আলো ও ছায়া’,
‘নির্ম্মাল্য’,
‘পৌরাণিকী’,
‘অম্বা,
গুঞ্জন’,
‘ধর্ম্মপুত্র’,
‘শ্রাদ্ধিকী’,
‘অশোক স্মৃতি’,
‘মাল্য ও নির্ম্মাল্য’,
‘অশোক সঙ্গীত’,
’সিতিমা’,
‘ঠাকুরমার চিঠি’,
‘দীপ ও ধূপ’,
‘জীবন পথে’ ও ‘ড: যামিনী রায়ের জীবনী’,
‘একলব্য’,
‘দ্রোণ-ধৃষ্টদ্যুম্ন’,
‘শ্রাদ্ধিকী’।

✅ অমিত্রাক্ষর ছন্দে রচিত ‘মহাশ্বেতা’ ও ‘পুন্ডরীক’ তাঁর দু’টি প্রসিদ্ধ দীর্ঘ কবিতা।

✅ তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে কবিতা ছাড়া অনুবাদ গল্প এবং স্মৃতিকথাও রয়েছে। এছাড়াও, তিনি শিশুদের জন্য গুঞ্জন নামের কবিতাসংগ্রহ ও বালিকা শিক্ষা নিয়ে প্রবন্ধগ্রন্থ রচনা করে তৎকালীন পাঠকসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। কামিনী রায় কবিতা লেখার শুরুতেই মধ্যযুগের নৈতিকতা দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন এবং মহাজগতকে পরস্পর বিরুদ্ধ শব্দ দ্বারা চিনতে শিখেছিলেন। তাঁর কবিতায় দেখা যায় পৃথিবীকে ও তার বস্তুসমূহকে সাদা-কালো, আলো-আঁধার, স্বর্গ-নরক ইত্যাদি বিপরীত শব্দ দিয়ে তিনি বুঝেছিলেন এবং পরপর বিপরীত শব্দগুলো দ্বারা কবিতার বাক্য গঠন করেছিলেন। কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যায়; যেমন ‘কেউ হাসে, কাঁদে কেউ/…..দুঃখে-সুখ রয়েছে বাঁচিয়া’, ‘জীবন ও মরণের খেলা’, “সুখ সুখ করি কেঁদনা আর, যতই কাঁদিবে ততই ভাবিবে, ততই বাড়িবে হৃদয়-ভার”। ‘ভাসাইয়া ক্ষুদ্র তরী’, ‘দিবালোকে’, ‘অন্ধকারে’, জীবন-মরণ একই মতন’, ‘মুক্তবন্দি’ ইত্যাদি অনেক ধরণের বাক্য তিনি ব্যবহার করেছেন।”

Related posts:

পদার্থ কাকে বলে ? পদার্থ ও বস্তু কি এক ?
প্রশ্ন : মূল্যায়ন কাকে বলে ? মূল্যায়ন কয় প্রকার ও কী কী ? যে - কোনো একপ্রকার মূল্যায়নের বিবরণ দি...
একক পাঠ পরিকল্পনা কাকে বলে ? পাঠ পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তা লিখুন । এর সুবিধা লিখুন ।
শিক্ষা পরিকল্পনা কাকে বলে ? শিক্ষা পরিকল্পনার শ্রেণিবিভাগ করুন । যেকোনো একপ্রকার পরিকল্পনার বিবরণ দি...
ধারণা মানচিত্র কাকে বলে ? এর বৈশিষ্ট্য লিখুন । বাস্তবায়নের উপায় লিখুন । এর গুরুত্ব লিখুন ।
পাঠ একক বিশ্লেষণ কাকে বলে ? পাঠ একক বিশ্লেষণের স্তর বা ধাপগুলি লিখুন
অন্তর্ভুক্তিকরণে ( সমন্বিত শিখনে ) প্রদর্শিত শিল্পকলার কীভাবে প্রয়োগ করবেন
প্রদর্শিত শিল্পকলার লক্ষ্য , বৈশিষ্ট্য , গুরুত্ব ও বাস্তবায়নের কৌশল
প্রাথমিক স্তরে পাঠদানের ক্ষেত্রে নাটকের ব্যবহার
মূল্যবোধ শিক্ষায় বিদ্যালয় ও শিক্ষকের ভূমিকা
মূল্যবোধ || মূল্যবোধের বৈশিষ্ট্য || প্রাথমিক স্তরে মূল্যবোধের শিক্ষার গুরুত্ব
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের শিক্ষায় তথ্য ও সংযোগসাধন প্রযুক্তির ভূমিকা
সমন্বয়িত শিক্ষণে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সমস্যা ও সাফল্য
পাঠক্রম পরিব্যাপ্ত শিক্ষণবিজ্ঞানে তথ্য ও সংযোগসাধন প্রযুক্তির ব্যবহার
পাঠক্রম পরিব্যাপ্ত শিক্ষণবিজ্ঞানে তথ্য ও সংযোগসাধন প্রযুক্তির ব্যবহার
উদাহরণসহ প্রকল্প পদ্ধতির বিবরণ
পূর্বসূত্রজনিত শিখন ( Contextualization ) কাকে বলে ?
জ্ঞান , পাঠক্রম , পাঠ্যবই , শিক্ষার্থী ও শিক্ষণবিজ্ঞানের মধ্যের সম্পর্ক
অনুসন্ধান পদ্ধতি
জ্ঞান নির্মাণ কীভাবে হয় উদাহরণসহ আলোচনা

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page