স্বর্ণকুমারী দেবী

💠 স্বর্ণকুমারী দেবী 💠

✅ স্বর্ণকুমারী দেবী বাংলা সাহিত্যের প্রথম মহিলা ঔপন্যাসিক। জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের এই কন্যা বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে বিশেষভাবে স্মরণীয় হয়ে আছেন। আসুন জেনে নিই তাঁর জীবন ও সাহিত্য কর্ম সম্পর্কে।

✅ প্রথম বঙ্গমহিলা স্বর্ণকুমারী দেবী বঙ্গললনাদের মধ্যে প্রথম ঔপন্যাসিক। তিনি ঐতিহাসিক ও সামাজিক দুই ধরনের উপন্যাস লিখেই খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। শৈশবেই তাঁর মধ্যে সাহিত্যানুরাগ লক্ষ করা যায়।

💠 স্বর্ণকুমারী দেবী জন্ম ও বংশপরিচয় :
স্বর্ণকুমারী দেবী ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে ২৮ আগষ্ট জন্মগ্রহণ করেন।তিনি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের চতুর্থ কন্যা। তাঁর তিন দিদির নাম ছিল সৌদামিনী, সুকুমারী ও শরৎকুমারী। তাঁর ছোটোবোনের নাম ছিল বর্ণকুমারী। সৌদামিনী ছিলেন বেথুন স্কুলের প্রথম যুগের ছাত্রী। ঠাকুর পরিবারের অন্যান্য মহিলা সদস্যেরা তাঁকে অনুসরণ করলেও, স্বর্ণকুমারী দেবী প্রধানত বাড়িতেই লেখাপড়া শিখেছিলেন।তিনি তাঁর অনুজ ভ্রাতা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চেয়ে পাঁচ বছরের বড়ো ছিলেন।

💠 স্বর্ণকুমারী দেবী শিক্ষা ও কর্মজীবন :
জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে শিক্ষার পরিবেশ ছিল। তিনি দুইবার ঠাকুরবাড়ির ‘ভারতী’ পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন।বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান-পরিভাষা রচনার বিষয়ে তাঁর বিশেষ আগ্রহ ছিল। তিনি অসংখ্য গানও রচনা করেছিলেন।সেই যুগের পরিপ্রেক্ষিতে স্বর্ণকুমারী দেবী বা কামিনী রায়ের মতো মহিলা সাহিত্যিকদের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। তাঁরা ছিলেন শিক্ষিত বাঙালি নারীসমাজের প্রথম যুগের প্রতিনিধি। সেই হিসাবে তাঁদের দায়িত্বগুলি সাহিত্যরচনার মাধ্যমে পালন করে গিয়েছিলেন তাঁরা। ১৮৭৯ সালে স্বর্ণকুমারী দেবী প্রথম বাংলা গীতিনাট্য (অপেরা) বসন্ত উৎসব রচনা করেন। পরবর্তীকালে তাঁর অনুজ রবীন্দ্রনাথ এই ধারাটিকে গ্রহণ করে সার্থকতর গীতিনাট্য রচনায় সফল হয়েছিলেন। ১৮৭৭ সালে জ্যোতিরিন্দ্রনাথ পারিবারিক পত্রিকা ‘ভারতী’ চালু করেন। এই পত্রিকার প্রথম সম্পাদক ছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর ।দ্বিজেন্দ্রনাথ সাত বছর এই পত্রিকা সম্পাদনা করেছিলেন। এরপর এগারো বছর এই পত্রিকা সম্পাদনা করেন স্বর্ণকুমারী দেবী। তিনি এই পত্রিকার স্বাতন্ত্র্য সৃষ্টি করতে কঠোর পরিশ্রম করেছিলেন। এই পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশিত হত। এর ভাষাও ছিল সহজ সরল। সমালোচকেরা এই পত্রিকার উচ্চ প্রশংসা করতেন।

💠 স্বর্ণকুমারী দেবীর উপন্যাস :
✅ দীপনির্বাণ (১৮৭৬)
✅ মিবার-রাজ (১৮৭৭)
✅ ছিন্নমুকুল (১৮৭৯)
✅ মালতী (১৮৭৯)
✅ হুগলীর ইমামবাড়ী (১৮৮৭)
✅ বিদ্রোহ (১৮৯০)
✅ স্নেহলতা (১৮৯২)
✅ কাহাকে (১৮৯৮)
✅ ফুলের মালা (১৮৯৫)
✅ বিচিত্রা (১৯২০)
✅ স্বপ্নবাণী (১৯২১)
✅ মিলনরাতি (১৯২৫)
✅ সাব্বিরের দিন রাত (১৯১২)

💠 ছোটগল্প :
✅ নবকাহিনি(১৮৯২)
✅ গল্পস্বল্প (১৮৯৩)

💠 নাটক- প্রহসন
✅ বসন্ত উৎসব(১৮৭৯)
✅ বিবাহ-উৎসব (১৮৯২)
✅ রাজকন্যা দিব্যকমল

💠 কাব্য – কবিতা
✅ কবিতা ও গান (১৮৯৫)

💠 বিজ্ঞান-বিষয়ক প্রবন্ধ
✅ পৃথিবী (১৮৮২)

💠 শিশুপাঠ্য :
✅ সচিত্র বর্ণবোধ, আদর্শনীতি ইত্যাদি।

💠 স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রতিভা :
রবীন্দ্রনাথের অগ্রজারূপেই কেবল তাঁর খ্যাতি সুপ্রতিষ্ঠিত নয়, তিনিই প্রথম বঙ্গমহিলা – সাহিত্যের সর্বতোমুখী পথে ছিল যাঁর স্বছন্দ পরিভ্রমণ। সংগীত, নাটক ও সাহিত্যে জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির পুরুষ সদস্যদের সৃষ্টিশীলতা স্বর্ণকুমারী দেবীকেও স্পর্শ করেছিল। এই সময় জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ঠাকুর এই তিন ক্ষেত্রে নানা পরীক্ষানিরীক্ষা চালাচ্ছিলেন। তাঁকে সাহায্য করছিলেন অক্ষয়চন্দ্র চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ। জ্যোতিরিন্দ্রনাথের জীবন-স্মৃতি থেকে জানা যায়, জানকীনাথ ইংল্যান্ডে গেলে স্বর্ণকুমারী দেবী জোড়াসাঁকোয় এসে থাকতে শুরু করেছিলেন। এই সময় তিনিও তাঁদের সঙ্গে নতুন পরীক্ষানিরীক্ষায় মেতে ওঠেন। জ্ঞানদানন্দিনী দেবী যখন পরিবারের প্রাচীন প্রথাগুলিকে নারী স্বাধীনতার পথ প্রশস্ত করছিলেন, ঠিক সেই সময় স্বর্ণকুমারী দেবী সাহিত্য সাধনায় মগ্ন ছিলেন। ১৮৭৬ সালে স্বর্ণকুমারী দেবীর প্রথম উপন্যাস দীপনির্বাণ প্রকাশিত হয়। ইতিপূর্বে ১৮৫২ সালে হানা ক্যাথরিন মুলেনস তাঁর ফুলমণি ও করুণার বৃত্তান্ত প্রকাশ করে বাংলা ভাষার প্রথম ঔপন্যাসিকের মর্যাদা লাভ করেছিলেন। কিন্তু স্বর্ণকুমারী দেবীই ছিলেন প্রথম বাঙালি মহিলা ঔপন্যাসিক। নাটক রচনার ক্ষেত্রে তিনি সচেষ্ট হয়েছিলেন।বাংলা ভাষায় জ্ঞানগর্ভ বিজ্ঞানমূলক প্রবন্ধ রচনায় বঙ্গমহিলাদের মধ্যে তিনিই প্রথমা। সুনির্বাচিত শব্দ দিয়ে পরিভাষা সৃষ্টিতে লেখিকার সচেতন মনের পরিচয় পাওয়া যায়।

💠 স্বর্ণকুমারী দেবীর সম্মান ও স্বীকৃতি :
১৯২৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্বর্ণকুমারী দেবীকে “জগত্তারিণী স্বর্ণপদক” দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯২৯ সালে তিনি বঙ্গীয় সাহিত্য সম্মেলনের সভাপতিত্ব করেন।

💠 মূল্যায়ন :
স্বর্ণকুমারী দেবী বহু দেশাত্মবোধক গান লিখে স্বদেশী মন্ত্রে দেশবাসীকে উদ্বুদ্ধ করেন। বঙ্গমহিলাদের মধ্যে তিনিই প্রথম ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ সম্মানের অধিকারিণী হন।১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর জীবনাবসান ঘটে।

✅ লিখেছেন – কুতুব আলী, বাংলা ছাত্র, রায়গঞ্জ।

Related posts:

তোত্তে- চানের আডভেঞ্চার - তেৎসুকো কুরোয়ানাগি
লিঙ্গ : পুংলিঙ্গ , স্ত্রীলিঙ্গ এবং ক্লীবলিঙ্গ ।
ভাষা শিক্ষণের নৈপুণ্যতা
আদর্শ বলা / আদর্শ কথন
স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির সঠিক উচ্চারণ
যুক্তবর্ণের উচ্চারণ : উষ্ট্র , রাষ্ট্র , ট্রেন , চিত্ত , বিত্ত , মত্ত , যুক্ত , রক্ত , শক্ত, যত্ন , ...
যুক্তবর্ণের উচ্চারণ : দ্বন্দ্ব , বিদ্বান , বিদ্বেষ , বদ্ধ , উদ্ধার
অনুলিখন vs শ্রুতিলিখন
কীভাবে শ্রুতিলিখন শ্রেণিকক্ষে শেখানাে যায় ?
বলা , পড়া ও লেখার ক্ষেত্রে যতিচিহ্নের যথাযথ ব্যবহার রীতি
বাংলা ব্যাকরণের কিছু প্রশ্নোত্তর
বলা , পড়া ও লেখার ক্ষেত্রে যতিচিহ্নের যথাযথ ব্যবহার রীতি
কীভাবে শ্রুতিলিখন শ্রেণিকক্ষে শেখানাে যায় ?
অনুলিখন vs শ্রুতিলিখন
কীভাবে হাতের লেখা শেখানাে হবে
ভালাে হস্তাক্ষরের বৈশিষ্ট্য
হাতের লেখা অনুশীলনের উদ্দেশ্য
স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির সঠিক উচ্চারণ
ভালাে কথাবার্তা শেখানাের কৌশল
আদর্শ বলা / আদর্শ কথন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page