সালােকসংশ্লেষের তাৎপর্য ( Significance of Photosynthesis )

📕 1.5 সালােকসংশ্লেষের তাৎপর্য ( Significance of Photosynthesis ) : সালােকসংশ্লেষের মূল তাৎপর্য বা গুরুত্ব হল তিনটি , যেমন :

📑 1. সৌরশক্তি আবদ্ধকরণ এবং খাদ্যের মধ্যে স্থিতিশক্তিতে রূপান্তরণ ( Entrapping of solar energy and its conversion to potential energy in food ) : পৃথিবীতে সমস্ত শক্তির উৎস হল সূর্য । সালােকসংশ্লেষের সময় সবুজ উদ্ভিদ সৌরশক্তিকে শােষণ করে এবং তাকে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে ATP- অণুর মধ্যে আবদ্ধ করে । পরে ওই শক্তি উৎপন্ন খাদ্যের মধ্যে স্থিতিশক্তি রূপে সঞ্চিত হয় । শ্বসনের সময় খাদ্য ওই স্থিতিশক্তি তাপ – গতিশক্তি রূপে মুক্ত হয় এবং উদ্ভিদের বিভিন্ন বিপাকীয় কাজে লাগে । পরভােজী প্রাণীরা উদ্ভিদজাত খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে প্রয়ােজনীয় শক্তি অর্জন করে থাকে ।

🧾 কাঠকয়লা , পেট্রোল ইত্যাদির মধ্যে যে শক্তি নিহিত থাকে , তা প্রকৃতপক্ষে অনেক বছর আগেকার উদ্ভিদের মধ্যে আবদ্ধ সৌরশক্তি ।

🔘 সবুজ উদ্ভিদের ক্ষেত্রে সৌরশক্তির আবদ্ধকরণ : সালােকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ার সময় পাতার মেসােফিল কলার অন্তর্গত ক্লোরােপ্লাস্টের মধ্যে থাকা ক্লোরােফিল অণু সূর্যালােকের ফোটন কণা শােষণ করে উত্তেজিত ও তেজোময় হয়ে ওঠে , একে ক্লোরােফিলের সক্রিয়তাবলে । ক্লোরােফিল কর্তৃক সূর্যালােকের শক্তিময় ফোটন বা কোয়ান্টাম কণা শােষণকে সৌরশক্তির আবদ্ধকরণ বলে ।

🔘 সৌরশক্তি আবদ্ধকরণের প্রক্রিয়া : সৌরশক্তি শােষণ করার পর ক্লোরােফিল উচ্চশক্তি সম্পন্ন ইলেকট্রন ( e ) ত্যাগ করে । বিচ্যুত ইলেকট্রন বিভিন্ন ইলেকট্রন বাহকের মাধ্যমে আবর্তিত হয় । আবর্তনকালে ইলেকট্রন তার শক্তির অনেকটাই হারিয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে । ইলেকট্রনের সেই শক্তি ATP- অণুর শক্তি বন্ধনীতে আবদ্ধ হয় । সৌরশক্তি এভাবেই রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে ATP- এর মধ্যে আবদ্ধ হয় ।

🧾 এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যায় যে , পাতায় উপস্থিত অ্যাডিনােসিন ডাই – ফসফেট ( ADP ) সৌরশক্তির প্রভাবে অজৈব ফসফেটের সঙ্গে যুক্ত হয়ে উচ্চশক্তি সম্পন্ন যৌগ অ্যাডিনেসিন ট্রাই ফসফেট ( ATP ) গঠন করে , একে ফটোফসফোরাইলেশন বলে ।

📑 2. গ্লুকোজের শ্বেতসারে রূপান্তর এবং তাকে সঞ্চয়ী অঙ্গে পরিবহন ( Conversion of glucose to starch and its transport to storage organs ) : সালােকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন হয় সরল শর্করা গ্লুকোজ , যা শ্বেতসারে রূপান্তরিত হয়ে উদ্ভিদের বিভিন্ন সঞয়ী অঙ্গে সঞ্চিত হয় । গ্লুকোজ থেকে প্রােটিন , ফ্যাট ইত্যাদি অন্যান্য খাদ্যবস্তু সংশ্লেষিত হয় । পরভােজী প্রাণীরা প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে এই উদ্ভিদজাত খাদ্যই গ্রহণ করে । তাই সালােকসংশ্লেষের ফলে উৎপন্ন খাদ্যই হল সমস্ত রকম খাদ্যের মূল উৎস ।

উদ্ভিদের সঞ্চয় অঙ্গে শক্তির প্রবেশ :

🔘 উদ্ভিদের সঞ্চয় অঙ্গে শক্তির প্রবেশ : সালােকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন গ্লুকোজ শ্বেতসার রূপে সঞ্চয় অঙ্গে সঞ্চিত থাকে । সালােকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সৌরশক্তি প্রথমে রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়ে ATP অণুর মধ্যে আবদ্ধ হয় এবং পরে উদ্ভিদের সঞ্চয় অঙ্গে সঞিত শ্বেতসার খাদ্যের মধ্যে স্থৈতিক শক্তি রূপে সঞ্চিত হয় ।

🔲 সালােকসংশ্লেষে উৎপন্ন অতিরিক্ত খাদ্যের সঞ্চয় অঙ্গ : সালােকসংশ্লেষে উৎপন্ন গ্লুকোজ শ্বেতসার হিসেবে উদ্ভিদের বিভিন্ন অঙ্গে সঞ্চিতি থাকে , যেমন :

📜 মূল — মূলাে , বীট , গাজর ।

📜 মৃদগত কাণ্ড — আলু , ওল , মানকচু , আদা , হলুদ ।

📜 বীজপত্র — ছােলা , মটর , মুসুর ।

📜 শস্য— ধান , গম , ভুট্টা ।

📜 ফল — আম , কলা , আপেল , আঙুর , খেজুর ।

📜 বীজ— বাদাম , কাঁঠাল বীজ ।

📑 3. পরিবেশে অক্সিজেন ও কার্বন ডাই – অক্সাইডের ভারসাম্য রক্ষায় সালােকসংশ্লেষ ( Maintenance of CO2 – Op balance in the environment by photosynthesis ) : বায়ুমণ্ডলে CO2 গ্যাসের স্বাভাবিক পরিমাণ হল 0.03 % এবং 02 – এর স্বাভাবিক পরিমাণ । হচ্ছে_20.60 % । নিম্নলিখিত উপায়ে পরিবেশে এই গ্যাস দুটির পরিমাণ স্বাভাবিক থাকে :

🔘 ( i ) বিভিন্ন খনিজ বস্তুর দহন এবং জীবের শ্বসনক্রিয়ার সময় পরিবেশের অক্সিজেন গ্যাস গৃহীত হয় এবং কার্বন ডাই – অক্সাইড গ্যাস বর্জিত হয় । ফলে পরিবেশে অক্সিজেনের পরিমাণ হ্রাস পায় এবং কার্বন ডাই – অক্সাইডের পরিমাণ বৃদ্ধি পায় । ফলে বায়ুমণ্ডলের অক্সিজেনের পরিমাণ কমে এবং কার্বন ডাই – অক্সাইডের পরিমাণ বাড়ে ।

🔘 ( ii ) সালােকসংশ্লেষের সময় সবুজ উদ্ভিদরা কার্বন ডাই – অক্সাইড গ্রহণ এবং অক্সিজেন বর্জনের মাধ্যমে পরিবেশের 02 – C02- এর ভারসাম্য বজায় রাখে ।

সালােকসংশ্লেষের সঙ্গে শক্তিচক্রের সম্পর্ক :

📑 4. সালােকসংশ্লেষের সঙ্গে শক্তিচক্রের সম্পর্ক : পৃথিবীর সমস্ত শক্তির উৎস হল সূর্য । সবুজ উদ্ভিদরা সালােকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় সৌরশক্তিকে ATP- এর মধ্যে রাসায়নিক শক্তি রূপে আবদ্ধ করে , পরে তা উৎপন্ন খাদ্যের মধ্যে স্থিতিশক্তি রূপে সঞ্চিত রাখে । শ্বসনের সময় এর অনেকটাই তাপ গতিশক্তি রূপে মুক্ত হয় এবং উদ্ভিদের বিভিন্ন বিপাকীয় কাজে লাগে । অবশিষ্ট স্থিতিশক্তি তৃণভােজী প্রাণীরা উদ্ভিদ বা উদ্ভিদজাত খাদ্যগ্রহণের মাধ্যমে অর্জন করে । ওই তৃণভােজী প্রাণীকে যখন কোনও মাংসাশী প্রাণী খায় , তখন তৃণভােজী প্রাণীর দেহ থেকে ওই শক্তির কিছু অংশ মাংসাশী প্রাণীর দেহে প্রবেশ করে । এভাবেই সালােকসংশ্লেষ প্রক্রিয়াটি শক্তিচক্রের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে উঠেছে ।

📝 শক্তিচক্রে শক্তির রূপান্তর : সৌরশক্তি——— রাসায়নিক শক্তি ———— স্থৈতিক শক্তি ———গতি শক্তি ।

📑 5. সালােকসংশ্লেষ ও মানবসভ্যতা ( Photosynthesis and Human civilization ) : আধুনিককালে মানব সভ্যতার অগ্রগতি প্রত্যক্ষ বা পরােক্ষভাবে অনেকাংশে সালােকসংশ্লেষের ওপর নির্ভরশীল। তুলা , রেয়ন , ফিল্ম , সেলােফেন কাগজ প্রভৃতি সেলুলােজ ( একরকম শর্করা ) থেকে তৈরি হয় । সেলুলােজের মূল উৎস সালােকসংশ্লেষ । গদ , রজন , রবার থেকে উৎপন্ন সামগ্রী মানব সভ্যতায় বিভিন্নরূপে ব্যবহৃত হচ্ছে । এগুলিও পরােক্ষভাবে সালােক সংশ্লেষজাত পদার্থ । মরফিন , বেলেডােনা , কুইনাইন , রেসারপিন । ইত্যাদি । ঔষধজাত সামগ্রীর মূল উৎসও হল সালােকসংশ্লেষ সভ্যজগতের উল্লেখযােগ্য দুটি অতি প্রয়ােজনীয় বস্তু কয়লা ও পেট্রোল নিঃসন্দেহে সালােকসংশ্লেষেরই অমূল্য দান । সুতরাং বর্তমানে সালােকসংশ্লেষ ছাড়া মানব সভ্যতা কল্পনা করা যায় না ।

আলােক বিশ্লেষণ ও অক্সিজেন নির্গমন :

📕 1.6 আলােক বিশ্লেষণ ও অক্সিজেন নির্গমন ( Photolysis and liberation of Oxygen ) :

🧾 উদ্ভিদ পরিবেশ থেকে জল সংগ্রহ করে পাতার মেসােফিল কলায় নিয়ে আসে । মেসােফিল কলার কোষে অবস্থিত ক্লোরােফিল সূর্যালােকের ফোটন কণা শােষণ করে সক্রিয় হয়ে ওঠে । সক্রিয় ক্লোরােফিল জলকে হাইড্রোজেন আয়ন ( H + ) এবং হাইড্রক্সিল ( OH– ) আয়নে বিশ্লিষ্ট করে । সূর্যালােকের উপস্থিতিতে সক্রিয় ক্লোরােফিল কর্তৃক জলের এই আয়নীকরণকে ফটোলাইসিস বা আলােকবিশ্লেষণ বলে ।

 সূর্যালোক

H2O —————> H+ + OH–
ক্লোরোফিল

🧾 এর পর হাইড্রক্সিল আয়ন ইলেকট্রন ত্যাগ করে হাইড্রক্সিল মূলকে পরিণত হয় । 4 অণু হাইড্রক্সিল মূলক থেকে পুনরায় 2 অণু জল এবং 1 অণু অক্সিজেন উৎপন্ন হয় । এই অক্সিজেনই পত্ররন্ধ্র দিয়ে পরিবেশে নির্গত হয় ।

    4OH   –     4e+     +  4[ OH– ]

     4 [ OH ] →   2H20 + O2⬆️

Related posts:

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের জীবন কথা
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী : 2024
চন্দ্রযান-3 : চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণকারী প্রথম দেশ ভারত
GENERAL STUDIES : TEST-2
GENERAL STUDIES : 1
কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স: 8ই সেপ্টেম্বর
'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
তপনের জীবনে তার ছোটো মাসির অবদান আলোচনা করো।
সমান্তরাল আলোকরশ্মিগুচ্ছ বলতে কী বোঝ ?
আলোকরশ্মিগুচ্ছ বলতে কী বোঝায় ? এটি কয়প্রকার ও কী কী ?
একটি সাদা কাগজকে কীভাবে তুমি অস্বচ্ছ অথবা ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যমে পরিণত করবে ?
ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
অস্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
স্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
অপ্রভ বস্তুও কি আলোর উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে?
বিন্দু আলোক - উৎস কীভাবে পাওয়া যেতে পারে ?
বিন্দু আলোক - উৎস ও বিস্তৃত আলোক - উৎস কী ?
অপ্রভ বস্তু কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
স্বপ্নভ বস্তু কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
দিনেরবেলা আমরা ঘরের ভিতর সবকিছু দেখতে পাই , কিন্তু রাত্রিবেলা আলোর অনুপস্থিতিতে কোনো জিনিসই দেখতে পা...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page