ভূতের গল্প : ডাইনির কুঠি

Thare was a land of Cavaliers and Cotton Fields called the Old South. Here in this pretty world, Gallantry took its last bow. Here was the last ever to be seen of Knights and their Ladies Fair, of Master and of Slave. Look for it only in books, for it is no more than a dream remembered, a Civilization gone with the wind.

‘কি সুন্দরভাবে মিথ্যে কথাগুলো সাজানো দেখ। আমাদের দেশের নীল আর চা, আমেরিকার তুলো আর তামাক, ক্যারিবিয়ানের চিনি – সাহেবদের এইসব ক্যাশ ক্রপ, যার সাথে কয়েকশো বছরের একটানা জঘন্য অপরাধ আর অমানুষিক অত্যাচারের ইতিহাস জড়ানো। অথচ এই প্ল্যানটেশন হাউস বা কুঠিবাড়িগুলো অসম্ভব চার্মিং, এদের নিয়ে কত গল্প-উপন্যাস, শিল্প, সঙ্গীত। এগুলোই সভ্যতার পিনাকল, রোম্যান্টিক গল্পের পটভূমি, এখানে সিনেমার স্যুটিং হয়, ট্যুরিস্টরা এগুলো দেখতে ভিড় জমায়। এই যেমন আমরা এসেছি। কিন্তু কন্যান ডয়েল সেই যে শার্লক হোমসকে দিয়ে বলিয়েছেন না – এই ম্যানর হাউসগুলো সব রকম অপরাধের তীর্থস্থান’ একটানা কথাগুলো বলে সঞ্জয় দম নিতে থামল। সৌম্যা ওর কাঁধে মাথা রেখে হাসছে।

‘হয়েছে, আর ভয় দেখাতে হবে না। এটা আরেকটা জালি হানাবাড়ি, স্রেফ ট্যুরিস্ট ঠকানো জায়গা, এর থেকে সমুদ্রে থাকলেই পারতাম।’

এখান থেকে সমুদ্রটা দেখা যায়না কিন্তু হাওয়ার ঝাপটায় সৌম্যার চুল এলোমেলো। নারকেল আর কৃষ্ণচূড়া গাছের ফাঁক দিয়ে পুরোনো কুঠিবাড়িটার রাজকীয় চেহারা দেখা যাচ্ছে, তার সামনে সবুজ ঘাসজমি, আদ্যিকালের পাথরে বাঁধানো রাস্তা, দুপাশে ফুলে ভরা নানারঙের জবা, ফ্ল্যামেনকো, আর বোগানভিলিয়ার ঝোপ। ওদের দলটা এখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। ওরা সবাই হিউসটন এলাকার প্রবাসী বাঙালি, দল বেঁধে প্রত্যেক বছরই কোথাও না কোথাও যায়, এবার এসেছে জ্যামাইকাতে। নানা বয়সের পরিবার, তার মধ্যে সঞ্জয় আর সৌম্যা সবচেয়ে ছোটো, ওদের বিয়ের পাঁচ বছরও হয়নি, যদিও বিয়ের আগে কলেজ জীবন থেকেই ওরা একসাথে থেকেছে বেশ কিছুদিন। সঞ্জয় ডাক্তার, হিউস্টনের একটা নামকরা মেডিক্যাল সেন্টারে কাজ করে, ফার্মাসিউটিক্যাল রিসার্চে ওর বেশ নামডাক আছে। ওদের মধ্যমণি সৌমিত্রদা, পঞ্চাশ ছাড়িয়েও চিরযুবক, পেশায় ইমিগ্রেশন ল’ইয়ার কিন্তু রিয়াল এস্টেটের ব্যবসায় অনেক টাকা করেছেন। হিউস্টনের দেশি মহলে উনি একজন কেউকেটা লোক। শহরে বাঙালির সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান, অর্থাৎ দুর্গাবাড়ি প্রতিষ্ঠায় ভদ্রলোকের মস্ত অবদান আছে, কিন্তু তাই বলে কোনো গ্রামভারী চালিয়াতি ভাব ওঁর স্বভাবে নেই। সবার সঙ্গে হৈ হৈ করতে ভালোবাসেন, একেবারে মাইডিয়ার মাটির মানুষ। ওঁর স্ত্রী অরুণাও খুব পপুলার ছিলেন। প্রায় দেড় বছর আগে বিনামেঘে বজ্রপাতের মতোই অরুণা হঠাৎ করে হাইওয়েতে একটা গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারা যান। তারপর নিজেকে বেশ গুছিয়ে নিয়েছিলেন সৌমিত্রদা। গোটা হিউস্টনের বঙ্গসমাজেই একটা শোকের আবহাওয়া নেমে এসেছিল। এবার অনেক বলে কয়ে ওরা সৌমিত্রদাকে আসতে রাজি করিয়েছে কিন্তু এখনও উনি খুব ডিপ্রেসড, সবাই প্রাণপণে ওঁকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করছে।

‘সৌমিত্রদা এই রোজ হলের ইতিহাসটা বেশ গা ছমছমে, নয়? আরেকবার গল্পটা বলুন না।’

ওরা সবাই বাড়িটার গেটের সামনে জমায়েত হয়েছে। সৌমিত্রকে বাদ দিলে তিনটে পরিবার, চন্দন আর এষা, সঞ্জয় আর সৌম্যা, সুপ্রতীক এবং মিলি। একমাত্র মিলিই চাকরি করে না কিন্তু ও সাংঘাতিক কাজের মেয়ে, ওকে ছাড়া এইসব দল বেঁধে হইহুল্লোড়, বেড়াতে যাওয়ার কথা ভাবাই যায়না। কোথায় কি ডিল পাওয়া যায়, কবে প্লেনের টিকিট সস্তা হবে, বাচ্চারা কি করবে, কোন রেস্টুরেন্টে খেতে যাওয়া হবে, সবেতেই মিলি আর মিলি। ওকে দেখতেও বেশ নায়িকা নায়িকা, দারুণ রবীন্দ্রসঙ্গীত গায়, মধ্য তিরিশেও ছিপছিপে, কাঁধ অবধি স্টেপকাট কালো চুলের ফ্রেমে ওর ধারালো মুখশ্রী, সেখানে সবসময় হাসির আলো জ্বালা থাকে। হাল্কা আইশ্যাডোর ফাঁকে ওর গাঢ় বাদামি ব্যস্ত চোখদুটো সবসময় চারদিকে নজর রাখছে। সৌমিত্রদার হাতে ক্যারিবিয়ানের কলোনিয়াল ইতিহাস বইটাও মিলির চোখ এড়ায়নি, তাই এই ফাঁকে ওঁকে দিয়ে একটু কথা বলানোর সুযোগটা ও ছাড়বে না। গল্পের গন্ধ পেয়ে দলটা ঘন হয়ে বসল। আকাশ মেঘলা, দূরে সমুদ্রের উপর সন্ধ্যা নামছে, একটু বাদেই শুরু হবে রোজ হলের বিখ্যাত ঘোস্ট ট্যুর। সৌমিত্রদা বইটা বন্ধ করে সোজা হয়ে বসলেন।

‘ওই তো সঞ্জয় বলছিল না—গন উইথ দা উইণ্ড। সুনীল সাগরের শ্যামল কিনারে এইসব স্বর্গদ্বীপের ইতিহাস কিন্তু শুধু ঘাম আর রক্তে চোবানো। যে ভদ্রলোককে সব বোম্বেটেদের আদিপুরুষ বলা যায় সেই ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯৪ সালে তাঁর দ্বিতীয় সমুদ্রযাত্রায় এখানে নোঙর ফেলেছিলেন। দ্বীপের বাসিন্দা অ্যারাওয়াক উপজাতির লোকেরা (উনি যাদের ইণ্ডিয়ান ঠাউরেছিলেন) ছিল অতি শান্তিপ্রিয় বোকাসোকা টাইপের, তারা বেশ উৎসাহ করেই অতিথিসৎকার করতে এসেছিল। স্প্যানিয়ার্ডরা যখন দেখল যে দ্বীপে সোনাটোনা কোথাও নেই তখন বাধ্য হয়ে ওই লোকগুলোকেই শিকলে বেঁধে জাহাজের খোলে পুরে ফেলল। জাহাজ ভাড়াটা তো তুলতে হবে, তাছাড়া বেচারাদের খ্রীষ্টান করে নরকের হাত থেকে বাঁচানোর দস্তুরি হিসাবে পুণ্যও কিছুটা জমা হয়ে গেল। স্প্যানিয়ার্ডরা অনেকদিন সমুদ্রে থেকে বোর হয়ে গেছিল কিনা, নেটিভদের নিয়ে নানারকম খেলা করে ওরা বেশ আমোদ পেত। যেমন কিনা মেয়েগুলোকে পাইকারিভাবে বিছানায় তোলা আর ছেলেগুলোর হাত-পা কেটে তরোয়ালের ধার পরীক্ষা করা। সে যাক কিছু দো-আঁশলা বাদ দিয়ে গোটা জাতিটাই প্রায় একশ বছরের মধ্যে মরে ফর্সা হয়ে গেল, সেই জায়গাটা দখল করল হেনরি মর্গ্যানের মতো জলদস্যুরা আর আফ্রিকা থেকে আমদানি করা নিগ্রো ক্রীতদাসের দল। এর মধ্যে ইংরেজরা এসে স্প্যানিশদের হটিয়ে দিয়েছে, তারা ব্যবসাদার লোক, জ্যামাইকার মাটিতে যে অন্যরকম সোনা ফলতে পারে তার খবর পেতেও তাদের দেরি হল না। ১৭১৬ থেকে ১৮৩৪ অবধি জ্যামাইকা হয়ে উঠল দাসব্যবসার একচেটিয়া ঘাঁটি। হাজার হাজার আফ্রিকানকে জাহাজ বোঝাই করে আখের ক্ষেতে চালান করা হতে থাকল। তখন সারা ক্যারিবিয়ান আর দক্ষিণ আমেরিকা জুড়ে রমরমিয়ে এইসব ক্যাশ ক্রপের ব্যবসা চলছে—চিনি, তুলো, কফি, তামাক। মানুষ খাটিয়ে লাভ সবচেয়ে বেশি শুধু জন্তুজানোয়ারের থেকে সহ্যক্ষমতা কম বলে মানুষগুলো একটু তাড়াতাড়ি মারা যায় এই যা। জাহাজের খোলে বমি করতে করতেও মরে বেশ কতগুলো। প্রথমদিকে এইসব খুচরো অসুবিধা কেউ গায়ে মাখেনি। শ’খানেক বছর পরে কিছু কিছু ঝামেলা দেখা দিল বটে। এই যে প্ল্যানটেশনটা দেখছিস এইরকম হাজার হাজার একরের সম্পত্তিগুলোয় মালিক আর দাসের অনুপাত দাঁড়িয়ে গেল ১:৪০। গণসংস্কৃতির প্রবাহ এমনই জিনিস যে চাবুক, শিকল, ধর্ষণ, ধর্মান্তর কিছুই তার চোরাস্রোত আটকাতে পারেনা। তাই হাইতি থেকে লুইসিয়ানা অবধি শিকড় ছড়িয়ে দিল এক অদ্ভুত ভাষা ও সংস্কৃতি — ক্রিওল। অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলোর মতো গড়ে উঠলো গান আর নাচের ছন্দ, ধর্ম আর মিথোলজি। আমাদের দেশের প্রান্তিক জনজাতিগুলোর মতন প্রকৃতির সঙ্গে আষ্টেপিষ্টে জড়ানো এই সংস্কৃতির কেন্দ্রে আছে ভুডু প্র্যাকটিস। কালোজাদু বদনাম নিয়ে ভুডু অনেক লোম খাড়া করা গল্পের বিষয় হয়েছে বটে কিন্তু আর পাঁচটা পুরোনো ধর্মের সঙ্গে ওর খুব একটা পার্থক্য নেই। সে যাক এই রোজ হলের গপ্পোটা যাকে বলে সাংঘাতিক–বিকৃতকামা নারী, মারণ-উচাটন, অকথ্য অত্যাচার আর ধারাবাহিক খুব সব একসাথে পাঞ্চ করা। তাইজন্য না দুনিয়ার লোক এই সাদা ডাইনির কুঠিতে ভুতুড়ে সন্ধ্যা কাটাতে আসে। অবশ্য এখানে যা দেখবে পুরোটাই অভিনয়।’

‘আমার বাবা এইসব বীভৎস ব্যাপার ভালো লাগে না। সৌমিত্রদা ইতিহাসের লেকচারটা বন্ধ কর প্লীজ। রাত্তিরবেলা এইসব বিদঘুটে ভূতের কেত্তন না দেখলেই নয়?’ এষার গলায় বেশ একটু বিরক্তি। ‘এই যে মহিলা অ্যানি পামার, এই বাড়ির মালকিন, সত্যিই ডাইনি ছিল নাকি–পর পর তিন স্বামীকে খুন করেছিল?’

‘আসলে পুরো গল্পটা শুনলে কিছু কিছু প্রশ্ন থেকে যায়। সে যুগে মেয়েদের যৌন স্বাধীনতা জিনিসটা বরদাস্ত করা হতনা, অখ্রীষ্টান শয়তানি কারবার বলে লেবেল মেরে দেওয়াই দস্তুর ছিল।’ সৌমিত্রদা বললেন। ‘অ্যানির বাবা-মা ব্রিটিশ, ভাগ্য ফেরাতে হাইতি দ্বীপে এসেছিল, সেখানে দুজনেই ইয়েলো ফিভারে মারা যায়। ও ধাইমার কাছে বড়ো হয়, সে বুড়ি আবার ছিল প্ল্যানটেশনের এক নামকরা ভুডু প্রিস্টেস। অ্যানিকে সে নিজের মেয়ের মতো মানুষ করেছিল, ইউরোপীয় সামাজিক শিক্ষার সঙ্গে ভুডু তন্ত্রমন্ত্রে তালিম দিতে ভোলেনি। শোনা যায় ১৮২০ সালে অ্যানি বেশ শাঁসালো কোনো ভদ্রলোক ধরে বিয়ে করার জন্য জ্যামাইকাতে হাজির হয়। সদ্য বড়লোক জ্যামাইকান ঔপনিবেশিক সমাজে তখন বিবাহযোগ্যা ইংরেজ তরুণীর বেজায় অভাব। কলোনির ভদ্রলোকেরা খুশিমতো দোআঁশলা পয়দা করতে পারেন কিন্তু সমাজে কলকে পেতে হলে কিংবা সম্পত্তি রেখে যাবার জন্য আইনমাফিক খাঁটি ইউরোপীয় রক্তের বৌ-বাচ্চা চাই। অ্যানি ছিল ছোটখাটো চেহারার এক রহস্যময়ী রূপসী, প্রথাগত গ্রুমিং আর সভ্যতার পালিশ ভেদ করে ফুটে বেরুত ওর আদিম আকর্ষণ। জন পামার নামে এক উঠতি বড়লোক ওর প্রেমে পাগল হয়ে গেল। এই যে দেখছো রোজ হল, এর চারপাশে তখন ছিল কয়েক হাজার একর জমি, দুশো ক্রীতদাস আর জনা পঞ্চাশ খাসচাকর, নায়েব, ওভারসিয়ার নিয়ে জন পামারের বিরাট প্ল্যানটেশান। বিয়ের বছরখানেকের মাথায় জন পামার রহস্যজনকভাবে মারা গেলেন, অ্যানি পামার এই বিরাট সম্পত্তির মালকিন হয়ে বসল, ততদিনে পুরো তল্লাটে রটে গেছে যে অ্যানি পামার আসলে ডাইনি, সেইই তুকতাক করে স্বামীকে খুন করেছে। তাতে অবশ্য বিয়ের বাজারে তার দর কমেনি। অ্যানি তারপর আরো দুবার বিয়ে করে এবং সেই দুই স্বামীও নাকি অল্পদিনের মধ্যেই মারা যায়। মহিলা তার বিরাট সম্পত্তি কড়া হাতে শাসন করত, নিষ্ঠুরতায় ও অন্যান্য দাসমালিকদের বহুগুণে ছাড়িয়ে গিয়েছিল নাকি। রোজ হলের চাকরবাকররা তাদের কর্তামাকে যমের মতো ভয় পেত। চাবুক মারা থেকে শুরু করে হাত পা কেটে দেওয়া কিংবা গুমঘরে আটকে রাখা, এসব তো নিয়মিত ছিলই, মাঝে মাঝে ভুডু অনুষ্ঠানে টাটকা রক্তের দরকার পড়লে, অ্যানি নাকি অবাধ্য দাসদাসীদের বাচ্চাগুলোকে তুলে আনত। মাঝরাত্তিরে শোনা যেত রক্ত জমানো চিৎকার। অ্যানির নাম হয়ে গেল রোজ হলের সাদা ডাইনি।

‘অ্যানির সবচেয়ে ভয়ানক খেলা ছিল স্বাস্থ্যবান যুবক ক্রীতদাসদের নিয়ে, যাদের ও বেছে বেছে কিছুদিনের জন্য নিজের বিছানায় তুলতো। সাদা ডাইনির অস্বাভাবিক যৌনক্ষুধা মেটানোর পর সেই ক্রীতদাসদের কেউ আর খামারের কাজে ফিরতে দেখেনি, তারা সব নাকি রক্তাপ্লতায় মারা যেত। তাদের ভুতেরা এখনো এই মাঠে হানা দিয়ে ফিরছে, সুন্দরী মেয়ে দেখলেই—’

‘ওরে বাবা, প্লীজ হোটেলে ফিরে চল!’ এষার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। এতক্ষণে অন্ধকারও দানা বেঁধে উঠেছে, সাদা খামারবাড়িটার গায়ে লাল আর সবুজ রঙের আবছা আভা। ভূতের কাণ্ডকারখানা শুরু হল বলে, বাসভর্তি ট্যুরিস্ট হাজির হয়েছে তারা ব্যাচে ব্যাচে বাড়িটার ভেতর ঢুকবে। সৌমিত্রদাও গল্পটা প্রায় শেষ করে এনেছেন।

‘অ্যানি মাত্র ত্রিশ বছর বয়েসে তার শোবার ঘরে খুন হয়। টাকু নামে যে ক্রীতদাস তাকে খুন করেছিল সেও ছিল অ্যানির প্রেমিক এবং ভুডু গুণীন। হয়তো মন্ত্রবলেই সে বুঝে ফেলেছিল যে তার দিন শেষ হয়ে এসেছে। তাছাড়া টাকু ছিল কিছুটা বয়স্ক, তার নাকি একটি মেয়েও ছিল। হবি তো হ, সেই মেয়েরই স্বামীর দিকে পড়লো সাদা ডাইনির নজর। ছেলেটি ভালো, নতুন বৌকে খুব ভালোবাসে, তাকে ছেড়ে ডাইনির বিছানায় যেতে চায়নি। জানতে পেরে অ্যানি যাদুবিদ্যা প্রয়োগ করে, টাকুর মেয়েটাও এক সপ্তাহের মধ্যে শুকিয়ে বিছানার সাথে মিশে যায়। রাগে, দুঃখে পাগল হয়ে টাকু গোপন পথে অ্যানির ঘরে ঢোকে, তারপর বিছানাতেই তাকে গলা টিপে খুন করে। টাকুকে গুলি করে মারে এক ওভারসিয়ার, তার সঙ্গে সঙ্গেই সব ক্রীতদাসেরা বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। রোজ হলের এই বিদ্রোহটা হয়েছিল ১৮৩০ সালে, নথিপত্রে তার হদিশ পাওয়া যায়। বাকি গল্পটার কোনো ঠিকঠাক প্রমাণ নেই, সাদা ডাইনির কাণ্ডকারখানা হয়তো পুরোটাই যাদুবাস্তব। সেই আমলে লোকে এমনিতেই অল্পবয়েসে মারা যেত। জ্যামাইকা তখন গুণ্ডা বদমায়েশ আর জলদস্যুদের আড্ডা। সুন্দরী বড়লোক বিধবাকে ছিঁড়ে খাবার জন্য লোকের অভাব ছিল না। ইউরোপ আর আফ্রিকা দুজায়গাতেই ডাইনি নিয়ে লোকের অবসেশন আছে, কত মেয়েকে এই বদনাম নিয়ে মরতে হয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। অ্যানির বেঁচে থাকার একমাত্র উপায় হয়তো ছিল ওর ওই ডাইনি বদনামটাকে আরো ভয়াবহ করে তোলা যাতে কেউ ওর দিকে নজর দিতে ভয় পায়। ওটাই হয়তো ছিল ওর এমপাওয়ারমেন্টের একমাত্র উপায়। সে যাই হোক অ্যানির কবর দেওয়া হয়েছিল বাড়ির পিছনের জমিতে, কিন্তু সে নাকি সাদা ঘোড়া আর চাবুক নিয়ে প্রতি রাতে এখনও তার সম্পত্তি টহল দিয়ে বাড়ায়। ১৯৭৭ সালে জন রলিন্স বলে এক ভদ্রলোক বাড়িটা কিনে নিয়ে মেরামত করান, রক স্টার জনি ক্যাশ এখানে কিছুদিন ছিল। সেই গানবাজনা আর পার্টির ঠেলাতেই কিনা কে জানে, এখানকার প্রেতাত্মারা বোধহয় একটু কমজোর হয়ে পড়েছে। তাও এখানে কেউ রাত কাটাতে চায়না। এখন এটা রিটজ-কার্লটন গ্রুপের হানাবাড়ি অন ডিসপ্লে, ভালোই রোজগারপাতি হয় কিন্তু ঠিক দশটার সময় চাবি বন্ধ, সব শুনশান। এখানে একটা আয়না আছে সেটায় নাকি এখনো অ্যানির ছবি দেখা যায়, অনেকে ফটোও তুলেছে। যাকগে অনেক বকবক হল, এবার চল, আমাদের ট্যুরের সময় গেছে।’ এষা কিছুতেই যেতে রাজি হল না, ওর মেজাজ একেবারে খারাপ হয়ে আছে। অগত্যা চন্দনও থেকে গেল বাসের কাছে, বাকিরা গাইডের সাথে বাড়ির ভেতরে ঢুকলো। গা ছমছমে একটা পাথরে বাঁধানো কোর্টইয়ার্ড, তার মাঝখানে একটা আদ্যিকালের বার, সেখানে দু-একজন বসে রাম খাচ্ছে। চারদিকে দাসব্যবসায়ীদের যন্ত্রপাতি ঝোলানো, মরচে ধরা লোহার শেকল, চাবুক, তালাচাবি আর বিকট চেহারার জাঁতাকল, যেগুলো নাকি খামারের চারদিকে পাতা থাকত। দাসেরা পালাতে গিয়ে ভুল জায়গায় পা ফেললেই লোহার দাঁতে পা আটকে যাবে, তখন অ্যামপুট করে বার করা ছাড়া উপায় নেই। তারপর তাদের একটু একটু করে পচে মরার জন্য গুমঘরে ঢুকিয়ে দেওয়া হত। বারের পিছনেই সেই গুমঘরে ঢোকার গুপ্ত দরজা। দুদিকে ঘোরানো সিঁড়ি, উঠতে গেলে বিচ্ছিরি মচমচে আওয়াজ, ঝাড়লণ্ঠনগুলো টিমটিম করে জ্বলছে, ঘোলাটে আলো-আঁধারির মধ্যে বিদঘুটে রং করা দেওয়াল আর অয়েল পেন্টিং। ভুতের ট্যুরটার খুব ভালো কোরিওগ্রাফি, মাঝে মাঝেই সেকালের পোষাক পরা ক্রীতদাসদের দেখা যাচ্ছে, নড়ে উঠছে টেবিলচেয়ার, মেঝের ওপর ঘুরপাক খাচ্ছে কুয়াশা, পিলে চমকানো চিৎকার করে দৌড়ে পালাচ্ছে কারা যেন। ঘন্টাখানেকের ট্যুর শেষ হবে অ্যানির কবরে, সেখানে ঘুটঘুটে অন্ধকার। ধুপ করে একটা আওয়াজ হল, তারপর মাটির ওপর শেকল ছেঁচড়ে নিয়ে যাবার শব্দ। সৌম্যা ভুতটুত মানে না, কিন্তু ও অজান্তেই সঞ্জয়ের হাত ধরে ফেলেছে শক্ত করে।

‘কি সৌমিত্রদা? থেকে যাবেন নাকি রাত্তিরে? মনে হচ্ছে ভূত দেখার এই সুবর্ণ সুযোগ। সৌমিত্রদা—’ সঞ্জয় উত্তর না পেয়ে এদিক ওদিক তাকালো।

‘আমি দেখলাম উনি দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছেন। নিচের মাঠে ওরা ভূত সেজে কিসব নাচগান করছিল।’ সৌম্যা বলল।

‘চল, বাসে ফেরার আগে ডেকে নেব। নির্ঘাৎ ওই ভৌতিক বারে বসে রাম টানছে।’ সুপ্রতীকের কথা শেষ হতে না হতেই অন্ধকার চিরে একটা তীক্ষ্ণ চিৎকার শুনতে পেল সবাই। এষার গলা – ‘হেল্প! প্লীজ হেল্প!!’

পাথরে বাঁধানো উঠোনের উপর ঘাড় গুঁজে পড়ে আছেন সৌমিত্রদা, একটা পা অস্বাভাবিকভাবে কোমর থেকে মুচড়ে রয়েছে, মাথাটা রক্তে মাখামাখি, দেখলেই বোঝা যায় মানুষটা উপরের বারান্দা থেকে পড়ে গেছে। এষার পুরো হিস্টেরিয়া, দাঁতে দাঁত লাগিয়ে গোঁ গোঁ করছে, চন্দন তাকে নিয়ে ব্যস্ত। ভূতের বাড়ির ম্যানেজার ছুটে এসেছেন। সৌমিত্র অজ্ঞান, কিন্তু তখনো বেঁচে আছেন। সঞ্জয় ওঁর মাথাটাকে সাপোর্ট দিয়ে, শ্বাস চালু রাখতে চেষ্টা করছে। এর মধ্যেই পুলিস আর অ্যাম্বুলেন্স হাজির হল, ঘন্টাখানেকের মাথায় ওরা সকলেই হাসপাতালে। ওদের ট্রিপ ইনসিওরেন্স করা আছে, একটু বাদেই রোগীকে মায়ামিতে এয়ার-লিফট করা হবে। ওদের ছুটি এখন দুঃস্বপ্ন হয়ে উঠেছে।

‘কি বলছিস সৌম্যা? লোকটা হাসপাতালে পড়ে আছে আর তোরা ওর বদনাম ছড়াচ্ছিস।’

‘যা সত্যি তাই বলছি মিলিদি। সৌমিত্রদার সঙ্গে অরুণাদির সম্পর্ক খুব খারাপ হয়ে গেছিল, বেঁচে থাকলে অরুণাদি ওকে ডিভোর্স করত। আমাকে নিজে বলেছে, সৌমিত্রদার নাকি কি একটা অ্যাফেয়ার চলছিল। এষার সাথে।’

‘এসব কথা এতদিন বাদে শুনছি কেন? এখন সৌমিত্রদা নিজেকে ডিফেণ্ড করতে পারবে না বলে?’

‘আসলে অরুণাদির মারা যাবার পরে সৌমিত্রদা এমন ভেঙে পড়েছিলেন যে ওই নিয়ে কথা তুলতে সবারই রুচিতে বেধেছিল। এখন মনে হচ্ছে সৌমিত্রদা হঠাৎ আত্মহত্যার চেষ্টা করলেন কেন? ঐ বাড়িতেই কেন ব্যাপারটা হল? এষা বলছিল—’

‘থাক থাক। এষার মতে সৌমিত্রদাকে ভূতে ঠেলে ফেলে দিয়েছে তাইতো? রিডিকুলাস’

‘আমি কি তাই বললাম? আচ্ছা, তুমি সঞ্জয়ের সঙ্গে কথা বলে দেখ। অরুণাদির মেডিক্যাল রিপোর্টে কিসব গণ্ডগোল ছিল।’

‘দেখ আমার ধারণা সৌমিত্রদা ডিপ্রেসড ছিলেন। সেদিন বিকেল থেকে মদ খাচ্ছিলেন। ওই বাড়ির মর্বিড পরিবেশ আর অ্যালকোহল সব মিলিয়ে ওঁর মাথায় আত্মহত্যার ঝোঁক চাপে।’ মিলি কথাটা শেষ করে দিল বটে কিন্তু অস্বস্তিটা রয়েই গেল। জ্যামাইকার পুলিশ কেসটা বন্ধ করে দিয়েছে। এখানকার পুলিশ কি করছে ও জানে না কিন্তু সঞ্জয় বলছিল কোনো অপরাধ বা ফাউল-প্লে সন্দেহ করা হচ্ছে না, অ্যাটেম্পটেড সুইসাইড বলেই মনে হয়। তবুও একই পরিবারে এরকম পরপর দু-দুটো দুর্ঘটনা হলে প্রশ্ন তো উঠবেই। মিলি এক বছর আগের ঘটনাগুলো মনে মনে সাজাবার চেষ্টা করল, বিশেষ করে একটা সন্ধ্যাবেলার কথা। নিউইয়ার্স ইভ, সৌমিত্রদার বিশাল বাড়িতে খুব জোর পার্টি জমেছে। বারোটার পরে সবাই যখন কিছুটা বেসামাল, এষা সৌমিত্রদার সঙ্গে বেশ একটু ফ্লার্ট করছিল বটে। সবাই হাসছিল কিন্তু অরুণাদিকে ও দেখেছিল মুখ কালো করে এক কোণায় আড়ষ্ট হয়ে বসে আছেন। এষা একটু ন্যাকামি করে বটে কিন্তু ওর মনটা খুব ভালো আর এরকম বড় পার্টির মধ্যে এসব একটু আধটু তো হয়েই থাকে। অ্যাক্সিডেন্টের দিন অরুণাদি নাকি ড্রাঙ্ক ড্রাইভিং করছিল, যেটা একটু অস্বস্তিকর হলেও অসম্ভব কোনোমতেই নয়, ও নিজেই তো কতবার টিপসি হয়ে ফিরেছে। এসব আবোলতাবোল কথা ভাবতে ভাবতেই ও হাসপাতাল পৌঁছে গেল।

‘সঞ্জয়, কেমন আছে রে সৌমিত্রদা আজকে?’

‘ওই একই রকম মিলিদি। হাত পা ভাঙা, লাংস আর কিডনিতে ফুটো, ওসব বেশ তাড়াতাড়ি ভালো হয়ে উঠছে কিন্তু মাথা আর ঘাড়ের ইনজুরিটাই সমস্যা। জ্ঞান ফিরলেও কোয়াড্রিপ্লেজিয়া মানে পুরো শরীরটাই অসাড় আর দুর্বল হয়ে যেতে পারে। কিছুদিন না কাটলে বোঝা যাবে না।’

‘সঞ্জয় তোর সাথে কথা আছে। চল কাফেতে গিয়ে বসি। আচ্ছা অরুণাদির অ্যাক্সিডেন্ট নিয়ে তুই ঠিক কি কি জানিস বলতো? তোর হাসপাতালেই তো নিয়ে এসেছিল।’

‘মিলিদি এসব কনফিডেনসিয়াল কিন্তু তোমাকে এটুকু বলতে পারি যে অরুণাদির রক্তে শুধু অ্যালকোহলই ছিল না, নারকোটিকও ছিল। অথচ ওঁর ওইরকম কোনো প্রেসক্রিপশন ছিল না।’

‘অরুণাদি নেশা করত এটা বিশ্বাস করা মুশকিল। আচ্ছা ওদের মধ্যে কোনো ঝগড়া হয়েছিল কিনা শুনেছিস।’

‘তুমি যা যা শুনেছো আমিও তাই শুনেছি। বাঙালি তিলকে তাল করে। কিন্তু কয়েকটা ব্যাপার খটকা লাগারই মতো। হাসপাতালে আমরা ছাড়া একটি অল্পবয়সী মেয়ে দু-একবার এসেছিল ওঁকে দেখতে। ভারতীয়, বোধহয় বাঙালি, প্রীতি সিন্‌হা না কি যেন একটা নাম, কিন্তু অ্যাকসেন্ট শুনে মনে হয় সেকেণ্ড জেনারেশন। আমরা কেউ ওকে চিনিনা। লোকের কিউরিওসিটির তো অভাব নেই, আর সৌমিত্রদাও নির্বাক, তাই অবাধে গুজব ছড়াচ্ছে। কেন জানিনা চন্দন ওঁর উপর খাপ্পা, অথচ জ্যামাইকায় যাবার আগে তো কিছু বুঝিনি। কে জানে বাবা—’

‘এষাই তো ওকে পড়ে যেতে দেখেছে তাই না?’

‘হ্যাঁ, তারপর থেকে ও কেমন একটা নার্ভাস ব্রেকডাউনে ভুগছে। হয়তো সেইজন্যই চন্দনের রাগ।’

‘আজ সন্ধ্যায় ওদেরও ডেকেছি, কথা বলে দেখবো তখন। সৌম্যাকে বলিস তাড়াতাড়ি চলে আসতে।’

‘সৌম্যা একটা কথা জিগ্যেস করছিল। এষা আর চন্দন বাসের কাছে ছিল, বাড়ির ভেতর ঢোকেনি তাইনা। অথচ সৌমিত্রদার পড়ে যাওয়াটা এষা দেখেছে বাড়িটার ব্যাকইয়ার্ডে, যেখানে স্লেভ কোয়ার্টারগুলো ছিল, সেখান থেকে। ওই দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে অ্যানি নাকি ওভারসিয়ারদের চাবুক মারা দেখত আর খিলখিল করে হাসত। তোমার মনে আছে মিলিদি আমরা যখন কবরখানার দিক থেকে দৌড়ে এলাম, চন্দন ওখানে ছিল না, ও আমাদের সঙ্গেই দৌড়ে এল কিন্তু বাড়ির ভিতর থেকে। এষার মতো ভিতু মেয়ে একলা স্লেভ কোয়ার্টারের দিকে গেছিল কেন?’

‘হুঁ। ওই প্যানিকের মধ্যে আমি খেয়াল করিনি, কিন্তু এখন মনে হচ্ছে সৌম্যা ঠিকই বলেছে। দাঁড়া দাঁড়া, চন্দনের হাতে একটা ড্রিঙ্ক ছিল না। বারে গেছিল নাকি?’

‘এষাকে একলা রেখে? একটু আনলাইক চন্দন, তাই না। ও যেমন পসেসিভ ছেলে।’

‘তুই কি বলতে চাইছিস?’

‘কিছু না। সৌম্যা বলছিল চন্দন সেই থেকে কেমন যেন অস্বাভাবিক ব্যবহার করছে।’

মিলি সৌমিত্রের ঘরে ঢুকল। গলার মধ্যে টিউব ঢোকানো, সৌমিত্রদা চোখ খুলছেন মাঝে মাঝে, কিন্তু কথা বলার প্রশ্নই আসে না। লম্বা, সুপুরুষ লোকটাকে কি অসহায় লাগছে। চারদিকে যন্ত্রপাতি, মনিটরের স্ক্রীনে নানারকম আঁকিবুকি আর সংখ্যা, সব মিলিয়ে একটা বিরাট প্রশ্নচিহ্ন। মিলি ঠিক করল আজ রাত্তিরে সবার সাথে পুরো ঘটনাটা রিভিউ করবে, যত অস্বস্তিই তাতে হোক না কেন।

শনিবার সন্ধ্যাবেলাটা ওদের সারা সপ্তাহে সবচেয়ে আরামের সময়। খেজুরে আড্ডা, হইচই, মদ্যপান আর দেশি সিনেমা দেখে সময়টা কাটে, মাঝে মাঝে পলিটিকস বা সাহিত্য আলোচনাও জমে বেশ। আজকে মুড আলাদা, ওরা বাচ্চাদের বেসমেন্টে পাঠিয়ে দিয়ে, বড় টেবিলটার চারিদিকে গোল হয়ে বসেছে, সকলের মুখ গম্ভীর। মিলিই কথা শুরু করল।

‘আমরা সবাই অনেকদিনের বন্ধু, প্রবাসে আত্মীয়স্বজন বলতেও আমরাই। এরকম একটা দুর্ঘটনার পরে আমাদের মধ্যে কিছু কিছু প্রশ্ন বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হতেই পারে। তাছাড়া আমাদের আরো বন্ধুবান্ধব আছে, সৌমিত্রদার কথা তো বলাই বাহুল্য, আমাদের হাজারটা প্রশ্নের উত্তর দিতে হচ্ছে রোজ। এতদিন আমরাও একটা শকের মধ্যে ছিলাম। এখন মাথা ঠাণ্ডা করে সেদিনের ঘটনাগুলোর দিকে আরেকবার ফিরে দেখা দরকার। আমরা যদি আলাদা আলাদা গপ্পো বলতে শুরু করি তাহলে বাজে গসিপ আর স্পেকুলেশন ছড়াবে। এ নিয়ে লিগাল ঝামেলাও শুরু হতে পারে, আমাদের রেডি থাকা উচিত।’

‘দাঁড়াও দাঁড়াও’ চন্দন রুক্ষ গলায় বলল, ‘মিলিদি তুমি কি বলতে চাইছ? আমরা গুজব ছড়াচ্ছি, না আমাদের নিয়েই গুজব ছড়ানো হচ্ছে? সত্যি কথাটা হল এই যে সৌমিত্রদাকে চিনতে আমরা ভুল করেছিলাম। ভদ্রলোকের এই অবস্থার জন্য উনি নিজেই দায়ী, হি ওয়াজ লিভিং আ ডবল লাইফ। এদিকে শিক্ষিত, অমায়িক, বাংলা সংস্কৃতির ধারক, অন্যদিকে পাক্কা ওম্যানাইজার, সংস্কৃতিচর্চার নামে পরের বৌদের সিডিউস করতে ওস্তাদ। অরুণাদির মৃত্যুর জন্য ওইই দায়ী। যা হয়েছে ভগবানের বিচারেই হয়েছে এখন ও নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করাই মঙ্গল। পুলিশকে আমি যা বলার বলেছি, আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু রিপিট দেম। ইন ফ্যাক্ট তুমি এসব কথা তুলবে জানলে আমি আসতামই না।’

‘চন্দন প্লীজ!’ ধরা গলায় এষা বলে উঠল। ওর ঠোঁট কাঁপছে, মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে।

‘চন্দন তুই এভাবে কথা বলছিস কেন? আমরা তোর বন্ধু, তোদের হেল্প করতে চাই। কিন্তু তুই যা জানিস পুরোটা খুলে না বললে কি করি বল? তুই বুঝতে পারছিস এটা একটা সীরিয়াস অ্যালিগেশন? তাও আবার এমন একজনের ওপরে যাকে সবাই সম্মান করে, এবং যে সাংঘাতিকভাবে অসুস্থ।’ সৌম্যা আহত গলায় বলল।

‘সৌম্যা আমি আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারছি না। তোরা আমায় মাপ কর, আমি খুব জোর ঘা খেয়েছি, আমাকে একটু সময় দে।’

‘কি ব্যাপারে ঘা খেয়েছিস একটু বলবি?’

‘না। খুলে আম আলোচনা করার বিষয় এটা নয়।’ চন্দন এবার এষার দিকে ফিরল, ‘এষা আমি কিন্তু আশা করেছিলাম যে তুমি আমাদের পারিবারিক ব্যাপারগুলোকে কনফিডেনশিয়াল রাখবে। বোঝাই যাচ্ছে তুমি রাখনি। আমাদের বোধহয় ম্যারেজ কাউনসেলারের সাথে আরেকবার বসা উচিত।’

এষা এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল। সৌম্যা, মিলি ওকে টেনে নিয়ে গেল অন্যদিকে। একটা ঝগড়া লেগে ওঠার আগেই চন্দন গ্লাসটা টেবিলের উপর নামিয়ে রেখে উঠে দাঁড়ালো।

‘আমাদের ব্যক্তিগত সমস্যা নিয়ে নাটক দেখাতে চাইনা। ভেবেছিলাম আগের দিনের মতো আড্ডা মারব কিন্তু তোমরা ঐ সুইসাইডাল লোকটা আর গডড্যামড বাড়িটা থেকে বেরোতে পারছ না। যখন পারবে তখন ইচ্ছে হলে ডেকো, কিন্তু তার আগে আড্ডা জমবে বলে মনে হয় না। এষা, আমি গাড়িতে গিয়ে বসছি, তোমার ইচ্ছে হলে এসো।’

‘তুই কিন্তু বাড়াবাড়ি করছিস চন্দন।’ সুপ্রতীকও এবার উঠে দাঁড়িয়েছে।

‘তাই নাকি? তা কি জানতে চাও বলেই ফেলোনা। আমি সৌমিত্রকে ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছি কিনা। না, তবে দিইনি বলে এখন আমার আপশোষ হচ্ছে। আমি বাঙালি ভদ্রলোকের ছেলে, বেইমানি দেখলেও আমার মাথায় খুন চাপে না। শুধ রাগে, দুঃখে মাথাটা জ্বলতে থাকে। আমি বারে বসে রাম খাচ্ছিলাম, বিশ্বাস না হয় বারের লোকটা সাক্ষী আছে।’

‘কিন্তু তুই ওকে ধাক্কা মারতে যাবিই বা কেন? সৌমিত্রদা তোর কি ক্ষতি করেছে?’ সঞ্জয় অবাক গলায় বলল।

‘ন্যাকামি হচ্ছে। তোর বৌকে জিজ্ঞেস কর? এষা নিশ্চয় তার প্রাণের বান্ধবীকে সব কিছু খুলে বলেছে। যাকে বলে ইন্টিমেট ডিটেলস।’

‘বিশ্বাস কর, না। আমরা জানি তোদের কিছু একটা ক্রাইসিস যাচ্ছে। কিন্তু ডিটেলস কিছু জানি না।’

‘তাহলে জানার দরকারও নেই। এনিওয়ে আমরা ক্যালিফোর্নিয়ায় মুভ করে যাচ্ছি। তোমরা সৌমিত্রকে নিয়ে আদিখ্যেতা কর আর গসিপটা পুরোনো হয়ে গেলে আমাদের কথা দয়া করে ভুলে যেও, লেট আস হ্যাভ আ নিউ বিগিনিং।’

মিলি এতক্ষণ এষার কাছে বসে ছিল। এবার সোজা গিয়ে দাঁড়ালো চন্দনের মুখোমুখি। ‘চন্দন তোদের মধ্যে কি হয়েছে আমার জানার দরকার নেই। তোর নামে খুনের অপবাদ দেব এটা তুই কি করে ভাবতে পারলি তাও জানিনা। তোরা যেখানেই যাস আমি সবসময় তোকে ভাইয়ের মতোই দেখব। আমার বাড়ি থেকে না খেয়ে কেউ চলে যায়নি, তোরাও যাবি না। আমার প্রস্তাব আমি ফিরিয়ে নিচ্ছি।’

অনেকক্ষণ বাদে সঞ্জয় স্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিল। ওদের শরীরদুটো চাদরের তলায় কাছাকাছি, সৌম্যা আদরের পরে গায়ে গা লাগিয়ে ঘুমোতে ভালোবাসে। এদেশের ভাষায় এই স্নাগল করার অভ্যেসটা সঞ্জয়ের ভালোই লাগে কিন্তু ওর আবার হাত পা ছড়িয়ে ঘুমানোর অভ্যাস। তাই ও অপেক্ষা করে থাকে কখন সৌম্যা ঘুমিয়ে পড়বে, তারপর আস্তে করে একটু তফাত হয়ে যায়।

‘শুনছো’।

অন্ধকারের মধ্যে একটা ঘুমে জড়ানো গলা। এই রে সৌম্যা ঘুমোয়নি, ও তার আগেই সরে গেছে।

‘ঘুমোওনি?’

‘আমি যদি অন্য কারো সাথে অ্যাফেয়ার করি তুমি কি তাকে খুন করতে চাইবে?’

‘হয়তো চাইব, পারব কিনা জানিনা। রোগাপটকা মানুষ।’

‘আর আমাকে কিছু করবে না?’

‘তোমাকে হার্ট করা আমার পক্ষে অসম্ভব সৌম্যা। মজবুরি বলতে পার। কিন্তু রাতদুপুরে এটা কিরকম আলোচনা শুরু করলে বলোতো।’

‘এষা আর সৌমিত্রদার ব্যাপারটা কিন্তু পুরোপুরি সত্যি, জানো।’

‘তাই নাকি? তা তুমি কি করে জানলে?’

‘এষা কনফেস করেছে। ওদের ফেয়ারওয়েলের আগের দিন। মিলিদিও ছিল। কি কেলেঙ্কারি তাই না?’ পিলাই টকস–সঞ্জয় মনে মনে হাসল। যৌনমিলন মানুষকে অল্পক্ষণের জন্য সরল আর অসাবধান করে দেয়, গোপন কথা বলার জন্য ওইটাই সবচেয়ে সহজ সময়।

‘আমি তো আগেই বলেছিলাম না তোমাকে। সৌমিত্রদার ওপর একটা অ্যাডমিরেশন, ভালোলাগা ওর অনেকদিন ধরেই আছে। মেয়েটা তো নরম মনের রোম্যান্টিক, কবিতা, গান এইসব ভালোবাসে, আর চন্দনটা হল গোঁয়ারগোবিন্দ, ফুটবল ফ্যান। সম্বন্ধ করে বিয়ে, ওদের মনের মিল হয়েছিল কিনা কে জানে। বাচ্চাকাচ্চাও তো হলনা, তাই নিয়ে এষার এত মনখারাপ কিন্তু চন্দন পাত্তাও দেয় না। অরুণাদি মারা যাবার পর ও প্রায়ই সৌমিত্রদার জন্য খাবার নিয়ে যেত, তারপর ওই যে একটা গানের প্রোগ্রাম হল না–‘

‘ওরা দুজনে দারুণ গেয়েছিল–দুঃখের তিমিরে যদি জ্বলে তব মঙ্গল আলোক, তবে তাই হোক। চন্দন বলল, গাইতে গাইতে সৌমিত্রদা কেঁদে ফেলেছিলেন।’

‘ওরা নাকি পরস্পরের মধ্যে একটা ইমোশনাল আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিল। কিন্তু এটা নিয়ে দুজনেরই খুব অপরাধবোধ ছিল জান। জ্যামাইকা যাবার আগেই এ নিয়ে ওর সাথে সৌমিত্রদার আলোচনা হয়। ওরা ঠিক করে ব্যাপারটা ওখানেই শেষ করবে।’

‘এসব জিনিস এত সহজে শেষ হয়না সোমা। যুক্তি আর প্যাশন এক জায়গায় থাকে না কখনো।’ সঞ্জয় একটা জোরে নিঃশ্বাস নিল– ‘সেদিন ওই বাড়িটাতে ঠিক কি হয়েছিল ভেবে দেখা যাক। এষা কি সৌমিত্রদার সাথে দেখা করেছিল? চন্দন জানতে পেরেছে এটা ওর ব্যবহার দেখেই বোঝা যায়। কিন্তু ঠিক কখন ও জানতে পেরেছে–জ্যামাইকা যাবার আগে না পরে?’

‘পরেই তো বলল। এষার ধারণা সৌমিত্রদা ওরই জন্য আত্মহত্যা করতে গেছিলেন। সাংঘাতিক অনুতাপ থেকে ও চন্দনকে সব বলে ফেলেছে। না বললেও তো পারত। শি কনফেসড অ্যাণ্ড বেগড ফর আ সেকেণ্ড চান্স। চন্দনও সম্পর্কটা বাঁচিয়ে রাখতে চায় কিন্তু এই শহর থেকে দূরে চলে যাবে—স্বাভাবিক তাইনা। আমি তো চন্দনের প্রশংসাই করব।’

‘এষা অকারণ অপরাধবোধে ভুগছে, নানা জায়গায় কনফেস করে নিজের দুর্বল মনের সাথে বোঝাপড়া করতে চাইছে। এরকম লোকেরা সিক্রেট রাখতে পারেনা, এমনিতেই সবাই টের পেয়ে যায়। ওর নিরাপত্তা নিয়ে আমার চিন্তা হচ্ছে। যদি চন্দন সত্যিই প্রতিশোধ নিতে চায়, তবে দেশের অন্যদিকে অচেনা শহরে এষাও নিরাপদ নয়।’

‘তার মানে তুমি বলছ যে চন্দনই–‘

‘আঃ সোমা, আমি কিছুই বলছি না। আমি ডাক্তার, ইনভেস্টিগেশনিস্ট, রোগের কারণ খুঁজে বার করার চেষ্টা করি, আন্দাজে কাজ করতে চাই না। মনে হচ্ছে রহস্যের চাবি দুজনের কাছে আছে। একজন সৌমিত্রদা কিন্তু তার অবস্থা তো যে কে সেই।’

‘অন্যজন বুঝি অ্যানি পামার?’

‘মাই গড সোমা। মাথা থেকে ভূতের গল্পটা নামাও তো! অন্যজন সেই মহিলা।’

‘কোন মহিলা? সৌম্যা উত্তেজনায় উঠে বসেছে।’

‘ওই যে প্রীতি সিন্‌হা না কে, হাসপাতালে নিয়ম করে সৌমিত্রদাকে দেখতে আসে। চুপচাপ বসে থাকে, মাঝে মাঝে ফুল রেখে যায়। কাল দেখি তক্কে তক্কে থেকে ওকে পাকড়াও করব।’

‘কি বলবে? এই যে শুনুন—আপনি কি সৌমিত্রদার আরেক প্রেমিকা? আপনিই বুঝি ওকে ঠেলে ফেলে দিয়েছেন?’

‘আরে না না শুধু একটু বাজিয়ে দেখব। মিলিদি আর সুপ্রতীকদাকেও বলে দেব আসতে।’

‘দেখ বাবা তুমি আবার ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ো না যেন।’

‘না রে বাবা। এখন ঘুমোতে দাও তো, কাল কাজ আছে।’

একটু বাদে সৌম্যা ঘুমিয়ে পড়লেও সঞ্জয় ওকে কাছেই রেখে দিল। ওর গায়ের গরমটা ভালো লাগছে এখন, অনুভব করতে পারছে ওর বুকের ওঠানামা। বিশ্বাস জিনিসটার কোনো বায়োলজিক্যাল ভিত্তি নেই, অথচ ওটা অক্সিজেনের মতোই অপরিহার্য। যেমন এই মুহূর্তে ওর বিশ্বাস করা দরকার—দশ বছরের সাথী এই ঘুমন্ত মানবীটি ওকে ভালোবাসে, ওর সঙ্গে রমণে তৃপ্তি পায়। কি ঠুনকো, কি হাস্যকর এই বিশ্বাস, অথচ এটাকে টিঁকিয়ে রাখার চেষ্টায় জীবনের চারদিকে খাটানো এইসব আজন্ম সংস্কারের বেড়াজাল—সমাজ, শিক্ষা, প্রেম আর ধর্মবোধ।

বিকেল। হাসপাতালের দিন দেখতে দেখতে গড়িয়ে যায়। রাউণ্ড হয়ে গেছে, সঞ্জয় এখন সৌমিত্রর ঘরের কাছে। সৌমিত্রদার অবস্থা একেবারেই সুবিধার নয়, ভাই এসেছেন ক্যানাডা থেকে, ছেলে আর আমেরিকান পুত্রবধু আছে, আরো দু-একজন বন্ধুবান্ধবও হাজির। কথা বলতে বলতে অনেকক্ষণ হয়ে গেল। সবার মনেই প্রশ্ন, সেই রাত্রে ঠিক কি হয়েছিল তাই একই গল্প ওদের বারবার বলতে হয়। সাতটা নাগাদ ওদের এগিয়ে দিতে গিয়ে দেখে এলিভেটরের পাশে যে একটা ছোটো ওয়েটিংরুম, সেখানে প্রীতি সিন্‌হা বসে একমনে কিসব কাগজপত্র দেখছে। ও কি তাহলে সবাই চলে যাবার পর ঘরে ঢুকবে? কিন্তু ভিজিটিং আওয়ার্সের বাইরে আই-সি-ইউতে কারো তো থাকার কথা নয়। পরিবারের লোক হলে অবশ্য আলাদা কথা।

মেয়েটি একমনে কাগজপত্র দেখে যাচ্ছে। খাটো স্কার্ট আর জ্যাকেটে বেশ মানিয়েছে ওকে, চেহারায় একটা আলগা চটক আছে, মুখে সামান্য মেক আপ, আধুনিক প্রফেশন্যাল যুবতীদের যেমনটা থেকে থাকে। কালো চুল টানটান পনিটেলে বাঁধা, কাঁধে কোচ কম্পানির ফ্যাশনদার ব্যাগ, আঙুলে আংটিও আছে তার মানে বিবাহিতা।

‘মিলিদি, রেডি থেকো, মেয়েটা বেরোচ্ছে, আমি ওর পিছু পিছু আছি’ টেক্সট করে দিয়ে ও এলিভেটরে উঠলো। মেয়েটি ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে আছে, সামান্য হেসে হাই বলল ঢোকার সময়। লবিতে একটা কফিশপে মিলি আর সুপ্রতীক অপেক্ষা করছিল, ঠিক সময়মতো ‘এক্সকিউস মি’ বলে ওরা মেয়েটিকে থামালো।

‘আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারি?’

‘কি নিয়ে বলুন তো।’ মেয়েটি একটু অবাক কিন্তু বিরক্ত নয়।

‘মিঃ বোসের কেবিনে আপনার সাথে কয়েকবার কথা হয়েছে। আমরা সবাই ওঁর বন্ধু, ওনাকে নিয়েই দু একটা প্রশ্ন ছিল, যদি কিছু না মনে করেন।’

‘কিচ্ছু মনে করব না’ মেয়েটি রহস্যময় হাসি হাসল, ‘ভাবছিলাম কবে আপনাদের সঙ্গে ঠিক করে আলাপ হবে। আমি কে তাই নিয়ে নিশ্চয়ই অনেক প্রশ্ন জমেছে আপনাদের মনে তাই না।’

‘এই তো হয়ে গেল, চলুন না এক কাপ কফি নিয়ে বসা যাক।’ স্টারবাকসের দোকানটায় বেশ ভিড়, ওরা একটু তফাতে গিয়ে বসল।

‘আমার নাম প্রীতি সিন্‌হা, আমার ঠিক পরিচয়টা আপনাদের আগে দিইনি, সেজন্য মাপ চাইছি। আসলে আমি আর সৌমিত্র বিবাহিত। নিউইয়র্কে অল্পদিন আগে আমাদের প্রথম দেখা তার আগে পরিচয় ছিল ফেসবুকে। আমাদের দুজনের জীবনই নানাদিক দিয়ে এলোমেলো ছিল কিন্তু কেন জানিনা আমরা পরস্পরকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলাম। আমরা বিয়ে করলাম আপনাদের ওই অভিশপ্ত বেড়াতে যাওয়ার ঠিক এক হপ্তা আগে। এই নিয়ে কি মারাত্মক সামাজিক ঝড় উঠতে পারে সেটা জেনেই আমরা সবকিছু গোপন রাখি। কথা ছিল জ্যামাইকায় হবে আমাদের গোপন হনিমুন, ফেরার আগে ও আপনাদের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেবে। ও বলেছিল আপনারা খুব ভালো বন্ধু, উদারমনস্ক আধুনিক লোক, আপনারা আমাদের কথাটাও শুনবেন, একপেশে বিচার করবেন না। তার আগেই তো এই সর্বনাশ কাণ্ড, সব প্ল্যান খতম। আসলে আমি মেয়েটাই অপয়া, দিস ইজ আ কারস্‌ড রিলেশনশিপ, সবারই জীবন ছারখার হয়ে গেল। এখনো এইসব কাগজপত্র আছে, আপনারা এগুলো নিয়ে আমাকে মুক্তি দিন। ওর ছেলের সামনে দাঁড়াবার সাহস আমার নেই, আপনারা আমার হয়ে ওর পরিবারের কাছে মাপ চেয়ে নেবেন। আমি কারো ক্ষতি করতে চাইনি।’

‘আপনি জ্যামাইকাতে গেছিলেন’ মিলি কোনোরকমে উচ্চারণ করল। বাকি সকলের চোয়াল ঝুলে পড়েছে, কথা বলার শক্তি নেই। অবাক হওয়ার সীমায় পৌঁছে গেছে সবাই।

‘গিয়েছিলাম কি ভেবে আর কি হয়ে গেল।’ প্রীতি কান্না সামলাতে সামলাতে ব্যাগ খুলে একটা সুদৃশ্য খাম বার করেছে–তার উপর লেখা ‘লাস্ট উইল অ্যাণ্ড টেস্টামেন্ট অফ সৌমিত্র বোস।’

‘এখানে স্ত্রী হিসাবে অরুণাদির জায়গায় আমার নামটা লিখে নোটারাইজ করা আছে। কিন্তু আমি এটা রাখতে চাইনা। আমি ভালো কোম্পানিতে কাজ করি টাকাপয়সার কোনো দরকার আমার নেই। আমার বাবা নেই, মা ডিভোর্সি, ইংল্যাণ্ডে থাকে। যে অসমবয়স্ক মানুষটার কাছে স্নেহ আর প্রেম দুইই পেয়েছিলাম, যার জন্য পুরো সমাজের বিরুদ্ধে দাঁড়াতেও পেছপা হতাম না, সে তো এখন একটা কাটা গাছের গুঁড়ির মতো অসহায়। যদি ও বেঁচে ওঠে তবে আবার এসে ভাঙা টুকরোগুলোকে জোড়া দেবার চেষ্টা করব। যদি না বাঁচে আমার কপালের দোষ কিন্তু সেক্ষেত্রে এই উইলটার কোনো দাম নেই আমার কাছে। জীবনে অনেক পুরুষমানুষের সাথে থেকেছি, বারণ করবার কেউ ছিলনা। সৌমিত্রর মতন এমন সহ্যশীল, স্নেহপ্রবণ অথচ ভালোবাসার কাঙাল আমি আর কোথাও পাব না। অরুণাদির সঙ্গে ওর কোনো মিল ছিল না জানেন, মানসিকভাবে ওরা দুই মেরুর বাসিন্দা। অসম্ভব ডিপ্রেসড ছিল কিন্তু কাউকে বুঝতে দিত না। সমাজ আর সন্তানের মুখ চেয়ে এতবছর ও একটা সম্পর্কের মৃতদেহ বয়ে বেড়িয়েছে। শুধু আমার কাছে ও সেই বোঝা নামিয়েছিল। কিন্তু কি হয়ে গেল দেখুন। জ্যামাইকাতে সেই ভয়ঙ্কর দিনটায় আপনাদের দলের সেই মেয়েটি, এষা না কি যেন নাম, কি কুৎসিতভাবে আমাকে গালিগালাজ করে গেল, আমি নাকি টাকার জন্য ওর সাথে শুয়েছি। ও আমাকে চিনলো কি করে জানি না, আমার ধারণা ছিল সৌমিত্র কাউকে বলেনি। আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম খুব রাগও হয়েছিল, ভেবেছিলাম এক্ষুনি গিয়ে সৌমিত্রর কাছে কৈফিয়ৎ চাইব। ফোন করে জানলাম আপনারা রোজ হলে ঘোস্ট ট্যুর নিতে যাচ্ছেন। ওখানে গিয়ে দেখি এষা আর এক ভদ্রলোক, ওর স্বামীই মনে হল, বাড়িটার সামনে একটা বেঞ্চে বসে বাংলায় কথা বলছে। কথা না বলে ঝগড়া বলাই ভালো। আমাকে দেখে এষা হঠাৎ উঠে বাড়িটার ভেতরে চলে গেল। ভদ্রলোক সোজা উঠে এসে আমায় চার্জ করলেন। আমি কে, সৌমিত্রদার সঙ্গে আমার কি সম্পর্ক, আমার মতলব আসলে কি, এইসব প্রশ্ন। তারপরেই শুনি একটা ধপ করে শব্দ আর এষার চিৎকার। আপনারা সকলে দৌড়ে এলেন, শো বন্ধ হয়ে গেল। ভয়ে আমার মাথা ঘুরতে লাগল, কি করব ভেবে পেলাম না। হঠাৎ মনে হল এখান থেকে পালাই। পরে পুলিশকে সব বলেছি, আমার গাড়ির ড্রাইভার ওখানে ছিল, সেও সাক্ষী আছে। আপনারা আর কি জানতে চান বলুন। আমার লুকোবার কিছুই নেই।’

প্রীতির চোখ দিয়ে তখনো টপটপ করে জল পড়ছে। মিলি এবার ওর হাতটা ধরল।

‘আর কিছু প্রশ্ন নেই আপনি যা যা খবর দিলেন তাই হজম করতে আমাদের খানিকটা সময় লাগবে। আপনি শান্ত হোন, আমাদের বন্ধু বলে মনে করুন। এই নিন আমার ফোন নাম্বার, দরকার হলেই ফোন করবেন। আর ওই উইলটা আপনার কাছেই আপাতত থাক।’

সঞ্জয় কি একটা বলতে গেছিল কিন্তু তার আগেই মিলি উঠে পড়েছে।

‘কেমন আছ সবাই?’ এষার ফোন।

‘ভালো। তুই কেমন আছিস সেইটা আগে বল।’

‘নতুন জায়গা কাউকে চিনিনা, তাই একা একা লাগে। চাকরিটাও তো ছেড়ে দিলাম। অবশ্য এই বোধহয় ভালো মিলিদি। ভাঙা জিনিস জোড়া লাগাতে হলে সময় তো দিতেই হবে তাই না?’

‘চন্দন ঠিক আছে? তোর ওপর কোনোরকম চাপ নেই তো’ মিলি একটু চিন্তিত।

যা ভেবেছিলাম তার চেয়ে অনেক ভালো আছে মিলিদি। একটু একটু করে অনেক কথা বলে এখন। উই আর ট্রাইং মিলিদি।’

‘ভালো থাকিস রে তোরা। সময় সব কিছু সারিয়ে দেয়।’

‘সৌমিত্রদা কেমন আছে’ এষার গলাটা ধরা শোনাল।

‘খুব একটা ভালো নেই রে। সঞ্জয় তো তাই বলল।’

‘সেদিন ওই কথাগুলো না জানলে আমি হয়তো সৌমিত্রদাকে ওভাবে—যাকগে আবার পুরোনো কথা ঘাঁটছি। আমি আসি মিলিদি। চন্দন জানতে পারলে রাগ করবে।’

‘কার কাছ থেকে কি শুনেছিলি তুই?’

‘পরে বলব মিলিদি। আমি জানতাম না সৌমিত্রদা বিয়ে করেছে। সেদিন সঞ্জয়ের কাছে ওই মেয়েটার কথা শুনে মাথাটা খারাপ হয়ে গেল। কিন্তু আমরা তো ঠিকই করেছিলাম যে যার জীবনটা নিয়ে থাকব।’

‘তুই আর নিজেকে দোষ দিস না। ভালো থাকিস, আমি আবার ফোন করব।’

ফোনটা কেটে দিয়েই আবার ডায়াল করল মিলি।

‘একটা কথা জিজ্ঞেস করব প্রীতি। সত্যি জবাব দেবে?’

‘দেবো মিলিদি। তোমার ওপর একটা ভরসা এসে গেছে আমার। প্রতিদিন ফোন করে আমাকে কতখানি যে সাপোর্ট দিয়েছ তুমি, জাননা। না হলে আমিও হয়তো সৌমিত্রের মতো—’

‘আবার আজেবাজে কথা।’ চোখ পাকিয়ে ছদ্ম বকুনি দিল মিলি, ‘তুমি অরুণাদিকে চিনতে? তোমাদের ব্যাপারটা অরুণাদি জানতেন কি?’

‘আমি ব্যক্তিগতভাবে ওঁকে চিনতাম না তবে আমার কথা উনি জানতেন। আসলে আমাদের ফেসবুকের বন্ধুত্বটা ওঁর কাছে ধরা পড়ে গেছিল। তাই নিয়ে সাংঘাতিক অশান্তি থেকে মারামারি অবধি। তোমরা জানতে না উনি কি রকম প্যারানয়েড আর কন্ট্রোলিং মহিলা ছিলেন। সত্যি বলতে কি উনিই আমাদের সম্পর্কটাকে পরিণতির দিকে এগিয়ে দেন। মাপ করো মিলিদি, মৃত মানুষের নামে আমার নিন্দা করা উচিত নয়।’

‘ঠিক আছে ওইটাই জানার ছিল। আমি আবার কালকে ফোন করব কেমন।’ ফোন ছেড়ে দিল মিলি।

‘সৌম্যা’।

‘বল মিলিদি’।

‘সঞ্জয় অ্যাক্সিডেন্টের দিন সকালে তোকে এষা আর সৌমিত্রদার ব্যাপারটা নিয়ে কিছু বলেছিল?’

‘না তো। ও সকাল থেকে সুইমিং পুলে ছিল। আমি বাবা ঘুমোচ্ছিলাম।’

‘হুঁ। তাহলে এষাকে সেদিন ওইসব কথা বলল কে? প্রীতির ব্যাপারটা তো ও জানতে পেরেছিল। তাই ওরকম আপসেট ছিল সেদিন।’

‘আমি তো কিছুই জানি না মিলিদি’।

‘ঠিক আছে, আমি পরে ফোন করব। ভালো থাকিস।’

সুপ্রতীক ঘরে এসে দেখে মিলি একগাদা কাগজ নিয়ে খুব মন দিয়ে আঁকিবুকি কাটছে।

প্রথম কয়েক ফোঁটা বৃষ্টির একটা অদ্ভুত গন্ধ আছে, সেটা দুনিয়ার সব জায়গায় এক। হাসপাতালের সামনে গাড়ি পার্ক করতে করতে সেই গন্ধটা টের পেল মিলি। ভোর হবার সময় হল কিন্তু কারপার্কে এখনো মেঘলা অন্ধকার। সৌমিত্রদার অবস্থা খুব খারাপ, এক্ষুনি সঞ্জয়ের ফোন এল।

‘মিলি তুমি সত্যিই এটা করতে চাও? আমরা কিন্তু অন্যভাবেও অ্যাপ্রোচ করতে পারি।’ সুপ্রতীক ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।

‘হ্যাঁ গো। উই ও দিস টু সৌমিত্রদা। তুমি শুধু আমার কাছাকাছি থেক।’ মিলির মুখটা থমথমে। সৌমিত্রদা শান্ত হয়ে বিছানায় শুয়ে আছেন, সবরকম যন্ত্রপাতি খুলে নেবার ফলে ওঁকে আবার আগের মতোই হ্যাণ্ডসাম দেখাচ্ছে।

‘এসো মিলিদি। সব শেষ হয়ে গেল, আমি সবাইকে ফোন করছি।’ সঞ্জয়ের গলাটা ধরা শোনালো। ওরা পাশের ঘরে গিয়ে বসেছে এবার।

‘সুপ্রতীকদা আসেনি?’

‘ও একটু পরে আসবে, কাছাকাছিই আছে। কখন হল?’

‘দুটো নাগাদ। ম্যাসিভ হার্ট অ্যাটাক। একদিক থেকে হয়তো ভালোই হল, পঙ্গু, অসহায় সবার করুণার পাত্র হয়ে বেঁচে থাকতে হত, তাও আবার ওই মহিলার খপ্পরে।’

‘কোন মহিলার কথা বলছিস’।

‘ওই যে সেদিন ন্যাকামি করে কেঁদে ভাসিয়ে দিল। জেনে রেখো, ঐ প্রীতি সিন্‌হাই এই অ্যাক্সিডেন্টের জন্য দায়ী। ও নির্ঘাৎ সেদিন ওই বাড়িতে ঢুকে সৌমিত্রদাকে চার্জ করেছিল। সি প্রোভোকড হিম টু কমিট সুইসাইড। আমি তো ভাবছি পুলিশকে কথাটা জানাব। ওই মহিলা সৌমিত্রদার সম্পত্তির মালিক হবে এটা ভাবলেই আমার রক্ত গরম হয়ে যাচ্ছে। তুমিও তো আবার সোহাগ দেখিয়ে উইলটা ফেরৎ দিয়ে দিলে। আমি বলছি, ওটা আমাদের কাছে থাকার দরকার ছিল।’ সঞ্জয় রাগে চেয়ার ছেড়ে উঠে পায়চারি করতে শুরু করেছে।

‘দাঁড়া দাঁড়া আগে একটা কথা বল দেখি? এষাকে ফোন করেছিলাম, ও যে বলল তুই প্রীতির ব্যাপারটা আগে থেকেই জানতিস। জ্যামাইকায় সেদিন সকালবেলা তুই নাকি এষাকে সৌমিত্রদার গোপন বিয়ের খবর সব বেশ ফলাও করে বলেছিলি। সত্যি নাকি রে?’

সঞ্জয় থমকে গেল। উত্তর দিতে প্রায় তিরিশ সেকেণ্ড দেরি হল ওর। ‘না না জানতাম না, ওই গুজব শুনেছিলাম আর কি। তুমি আবার এ নিয়ে এষার সাথে কথা বলেছো। মেয়েটার এমনিতেই মাথার ঠিক নেই।’

‘হ্যাঁ বেচারা খালি নিজেকে দোষী ভাবছে। সৌমিত্রদা ওর মনে দুঃখ দিয়েছিলেন বটে। ওকে ঘর ভাঙতে বারণ করেছিলেন, চন্দনের সঙ্গে সম্পর্কটা আবার করে শুরু করতে বলেছিলেন। প্রীতি নয়, সেদিন এষার সাথে কথা বলতে বলতেই তো সৌমিত্রদা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তবে সে অসুখের জন্য এষা বোধহয় দায়ী নয়। ও বেচারা তো এক গ্লাস জল আনতে ছুটে গিয়েছিল।’

‘সাতসকালে কি সব গল্প বানাচ্ছ মিলিদি? তুমি তো নেশা টেশা করতে না।’ সঞ্জয়ের গলাটা রুক্ষ শোনাল, ‘ফোন-টোন গুলো করতে হবে না কি?’

‘আরে ফোন করার সময় তো পড়েই আছে, শোন না। আমার কিন্তু একটা নালিশ আছে। তুই আর সৌমিত্রদা যে পার্টনার, একসঙ্গে রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা করছিলি, এটা তো বলিসনি। জানলে আমিও নেমে পড়তাম। অবশ্য এই রিশেশনের বাজারে রিয়েল এস্টেটের যা অবস্থা। শুনলাম ২০০৮ সালের হাউসিং বাবলটা ফাটার সময় তোর নাকি সৌমিত্রদার কাছে অনেক টাকা ধার হয়ে গেছিল–এই ধর কয়েক মিলিয়ন, তাই না! প্রীতি যে বলল, সৌমিত্রদার কাছ থেকেই শুনেছে।’

‘আউট্রেজিয়াস। তুমি কি আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছ মিলিদি! মতলবটা কি তোমার?’

‘আরে না না আগে তো সবটা শোন। সুপ্রতীকের অনেক গলফ খেলার বন্ধু আছে জানিস তো। তার মধ্যে একজন তোদের ডিপার্টমেন্টের ডাক্তার, রিচ গোলডম্যান না কি যেন নাম। বলল তুই নাকি কি একটা রিসার্চ প্রজেক্ট নিয়ে ঝামেলায় পড়েছিস, এনকোয়ারি হবে, সাসপেনশনও হতে পারে। কি একটা নতুন ওষুধ যেটা নাকি একটু বেশি ডোজে নিলে রক্তচাপ হু হু করে বেড়ে যায়, পেশেন্টের স্ট্রোক বা হার্ট-অ্যাটাক অবধারিত।’

সঞ্জয়ের মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। চাপা দাঁতের ফাঁক দিয়ে হিসহিস করে কথাগুলো বেরুল, ‘আমাকে ফাঁসাতে চাইছ তাই না? ডিটেকটিভ হয়েছ? সৌমিত্রদার সাথে শোবার ইচ্ছা তোমারও ছিল বুঝি? নাহলে ওর জন্য এত দরদ কিসের? লোকটা আমার টাকা নিয়ে ব্যবসা করে আমাকেই ডুবিয়েছে কিন্তু নিজে ঠিক পিছলে গেছে। কিন্তু তার সঙ্গে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। আর আমার রিসার্চের ব্যাপারে আমি তোমার কাছে কৈফিয়ৎ দেব না। তোমাদের সব ছেনালিপনা আমার জানা আছে।’

‘এই তো আসল চেহারাটা দেখা যাচ্ছে। ডঃ সঞ্জয় মজুমদার, ওই ওষুধটার নাম ক্রিবোস্ট্যাটিন তাই না? ওটার ওপর তোমার অনেক আশা ছিল কিন্তু ওই বিপজ্জনক টক্সিসিটির জন্য পুরো প্রজেক্টটাই সোজাসুজি বাতিল হয়ে যেত। মরিয়া হয়ে তুমি ডাটাগুলোকে এদিকওদিক করে, নানাভাবে জোচ্চুরি করে রিপোর্ট দাখিল করলে যাতে তোমার গ্রান্ট বজায় থাকে, প্রমোশনটাও হয়ে যায়। কিন্তু এদিকে তোমাদের রিয়েল এস্টেটের ব্যবসা ডকে উঠেছে, সৌমিত্রদার সে ক্ষতি সহ্য করার ক্ষমতা থাকলেও তোমার নেই। ওদিকে তোমার জুয়াচুরিও ধরা পড়ে গেছে, চাকরি থাকবে কিনা সন্দেহ।’

‘মিথ্যে কথা, সব মিথ্যে কথা’ সঞ্জয় বিড়বিড় করে বলল। সৌমিত্র আগে থেকে টের পেয়ে নিজের পয়সা সরিয়ে ফেলেছিল।’

‘তুমি আমাদের সাহায্য চাইতে পারতে কিন্তু তোমার অহংকারে বাধল। তুমি অপরাধের পথে আরো খানিকটা নেমে যাওয়াই ঠিক করলে। অরুণাদির কাছে তুমি প্রীতির কথা জানতে পার। সৌম্যার সন্দেহ ছিল এষার সাথে সৌমিত্রদার কিছু একটা আছে, তুমিও তার আঁচ পেয়েছিলে। সৌমিত্রদা প্রীতির সঙ্গে বিয়ের পরেই টাকাটা ফেরত চেয়েছিলেন। তুমি ভাবলে ক্রিবোস্ট্যাটিনের এই মারাত্মক সাইড এফেক্টটাকে কাজে লাগালে কেমন হয়। তাই ল্যাবের স্টক থেকে ওষুধ সরিয়ে নিজের কাছে রেখেছিলে, অডিটে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে। জ্যামাইকার ট্রিপটা ছিল তোমার একটা বড় সুযোগ। ক্যারিবিয়ানের অপরিচিত পরিবেশে ক্রাইমটাকে লুকিয়ে রাখা যায় একটা অস্পষ্টতার চাদরে — ভূতের বাড়ি, হিস্টেরিয়াগ্রস্থ নারী আর ত্রিকোণ প্রেমের কেচ্ছায় জড়ানো পারফেক্ট মার্ডার। অরুণাদি নেই, একমাত্র ছেলে দূরে থাকে, কাগজপত্র কোথায় কি আছে কে জানে, তারপরে এইসব কেলেঙ্কারি। এসবের মধ্যে ধার শোধের ব্যাপারটা ধামা চাপা পড়ে যেত তাই না?’

‘ইউ আর টু স্মার্ট টু লিভ মিলিদি।’ সঞ্জয়ের মুখে বিকট হাসি। ও পায়ে পায়ে মিলির কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। এইবার ঘরের দরজাটা বন্ধ করে দিতে গেল। কিন্তু তার আগেই এক ঝটকায় দরজা খুলে সুপ্রতীক ঘরে ঢুকে পড়েছে।

‘এই যে ডাক্তারবাবু আরেকটা খুন করার চেষ্টায় আছো নাকি? সেদিন টুক করে সৌমিত্রদার রামে ওষুধ মিশিয়ে দিলে কিন্তু কপাল খারাপ। লোকটা কোথায় ঐসব ভুতুড়ে চেঁচামেচির সময় হার্ট অ্যাটাক হয়ে অক্কা পাবে, তার বদলে বমি করতে করতে ব্যালান্স হারিয়ে বারান্দা থেকে উলটে পড়ে গেল। অ্যানি পামার মাথায় পাঁচ ফুটের কম ছিল, যাতে ওর অসুবিধা না হয় সেইজন্য ব্যালকনির রেলিংগুলো খাটো করে দেওয়া হয়েছিল কিনা। তা সৌমিত্রদার কঠিন প্রাণ বটে, টিঁকে রইল এতদিন, ভালোও হয়ে উঠছিল একটু একটু। বাধ্য হয়ে আজ সন্ধ্যায় সেকেণ্ড ডোজটা দিতে হল তাই না? প্লীজ কাম ইন ইনস্পেক্টার আপনি তো এতক্ষণ ধরে সব কথাই শুনলেন। হিউস্টন পুলিশ তো কেসটা এখনো বন্ধ করেনি।’

‘আমার ভয় করছিল।’ সুপ্রতীকের কাছে সরে এসে মিলি বলল। ও উত্তেজনায় হাঁফাছে।

‘আরে তুমি হলে আমাদের মহিলা ব্যোমকেশ। এরকম সূত্র সাজিয়ে সাজিয়ে অপরাধীকে ধরতে এলেম লাগে। আমাকে বিয়ে যদি না করতে তো দুনিয়ার অনেক উপকার হত, অবশ্য আমি মারা পড়তাম।’ সুপ্রতীক ওকে কাছে টেনে নিল।

‘আমি এই বেশ আছি বাবা। আমার এখন চিন্তা হচ্ছে বেচারা সৌম্যার জন্য, অন্য কারুর কাছে খবর পাবার আগে আমি ওর কাছে যেতে চাই।’

‘একটা প্রতিজ্ঞা করছি। তোমরা মেয়েরা এই যে ফোনে ঘন্টার পর ঘন্টা বকবক কর, আমি আর তা নিয়ে রাগারাগি করব না। ফোনে ফোনেই এই রহস্যের সমাধান করলে কিনা।’

খোলা দরজা দিয়ে ইউনিফর্ম পরা লোকজন ঢুকছে, সঞ্জয় দুহাতে মাথা চেপে মাটিতে বসে। সৌমিত্রদা একইভাবে যেন ঘুমিয়ে আছেন, তাঁর আর এসবে কিছু আসে যায় না। বৃষ্টি-কুয়াশা ভেদ করে এইবার জানলায় দেখা দিয়েছে একফালি ভোরের রোদ্দুর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page