প্রকল্প পদ্ধতি কাকে বলে ? এর সুবিধা ও অসুবিধা লিখুন

প্রশ্ন : প্রকল্প পদ্ধতি কাকে বলে ? এর সুবিধা ও অসুবিধা লিখুন ।

উত্তর : প্রকল্প পদ্ধতি সম্পর্কে Stevenson বলেন , সমস্যামূলক কাজ যখন স্বাভাবিক পরিবেশে সম্পন্ন হয় তখন তাকে প্রোজেক্ট বলে ( It is a problematic act carried to completion in its natural setting )। Ballard- এর মতে , বিদ্যালয়ে প্রোজেক্টের মাধ্যমে বাস্তব জীবনের কিছু অংশ খুঁজে পাওয়া যায় ( Project is a bit of real bit that has been imported into the school ) । F. Theodore বলেন , প্রোজেক্টে বিভিন্ন ধরনের কাজের মধ্যে সমন্বয়সাধন করে , অন্যথায় বিশৃঙ্খলার কারণ ঘটে ( Project aims at bringing unity out of what might otherwise bewilderment ) ।

প্রকল্প পদ্ধতির সুবিধা :

1. এই পদ্ধতিটি শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক মনস্তত্ত্বসম্মত ও গণতন্ত্রসম্মত । এক্ষেত্রে ছাত্ররা পরিকল্পনা করে , নিজেরাই কাজ করবে , পরস্পরের সঙ্গে আলাপ – আলোচনাও করে ।

2. এখানে শিক্ষার্থীরা নিজের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী শেখার সুযোগ পায় ।

3. শিক্ষার্থী এখানে কর্মের মাধ্যমে শিক্ষালাভ করে বলে প্রতিটি কাজের যে বিশেষ মর্যাদা আছে তা সে বুঝতে শেখে ।

4. কর্মের মাধ্যমে শিক্ষালাভ হওয়ায় তা ভুলে যাবার সম্ভাবনা কম ।

5. সহযোগিতার মনোভাব , আত্মপ্রত্যয় , স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা প্রভৃতি মানসিক বৃত্তিগুলির বিকাশ ঘটে ।

6. এক্ষেত্রে জোর করে শৃঙ্খলা চাপিয়ে দেওয়া হয় না । কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থী নিজেই শৃঙ্খলার গুরুত্ব উপলব্ধি করে ।

7. প্রোজেক্ট পদ্ধতিতে গণতান্ত্রিক চেতনা ও যৌথচেতনা গড়ে ওঠে ।

৪. ব্যক্তিগত পার্থক্য ভেদে শিক্ষার সুযোগ আছে । মেধাবী ছাত্র যেমন তার মেধা অনুযায়ী কাজ করার সুযোগ পায় , সাধারণ শিক্ষার্থীও তেমনি তার বুদ্ধি অনুযায়ী কাজ করতে পারে ।

9. প্রোজেক্ট একটি অনুবন্ধ পদ্ধতি । একাধিক বিষয়ে শিক্ষালাভ করার সুযোগ এখানে আছে । বিজ্ঞান বিষয়ক একটি প্রোজেক্ট সফল করে তুলতে গেলে ইতিহাস , ভূগোল , অঙ্ক , সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ের জ্ঞান অর্জনের সুযোগ হয় ।

10. বাস্তব প্রয়োজন মেটানোর মধ্যেই যে শিক্ষালাভ করা যায় এবং শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য যে বাস্তব সমস্যাসমাধান , এ ধারণা শিক্ষার্থীর জন্মে ।

11. জ্ঞান অর্জন এবং তার বাস্তব প্রয়োগ ছাড়াও এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীর সামাজিক ও প্রাক্ষোভিক বিকাশের সহায়ক হয় ।

12. শিক্ষার্থীর মৌলচিন্তার ( original thinking ) বিকাশ ঘটে ।

13. পুথিগত বিদ্যার দৌরাত্ম্য থেকে প্রোজেক্ট শিক্ষার্থীকে মুক্তি দেয় ।

14. নিজের হাতে শিক্ষার্থীদের কাজ করতে হয় , ছবি আঁকতে হয় , রিপোর্ট লিখতে হয় , ফলে শিক্ষার্থীদের এইসব বিষয়ে দক্ষতা বাড়ে ।

15. শিক্ষার্থীরা আলোচনায় অংশগ্রহণ করে , বই পড়ে , প্রোজেক্টের কাজের জন্য তাদের বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয় , মডেল তৈরি করতে হয় ইত্যাদি । সুতরাং এইসব কাজের মাধ্যমে তাদের মধ্যে বিষয়ের প্রতি আগ্রহ ও সৃজনধর্মী কাজে উৎসাহ বাড়ে । তারা জীবনকেন্দ্রিক বিভিন্ন সমস্যাসমাধানে আগ্রহী হয় ।

16. শিক্ষার্থী যখন প্রোজেক্টে অংশগ্রহণ করে তখন তাকে সেই প্রোজেক্ট সংক্রান্ত বিষয়ে জানতে হয় । এই জানার জন্য সে বই পড়ে , শিক্ষকমহাশয়ের সঙ্গে , যিনি এই বিষয় বোঝেন তার সঙ্গে ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গেও আলোচনা করে । ফলে ওই বিষয়টি সম্বন্ধে তার জ্ঞান , বোধ , প্রয়োগ ও দক্ষতার যথাযথ বিকাশ ঘটে ।

17. ওই বিষয়ক বৈজ্ঞানিক সূত্র , তথ্য সম্বন্ধে জ্ঞানলাভ করতে পারে ।

18. শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক গড়ে ওঠে ।

19. এই পদ্ধতির মাধ্যমে থর্নডাইকের শিখনের সূত্রগুলি ফলপ্রসূ হয় , যেমন—

(a) প্রস্তুতি সুত্র — যেহেতু শিক্ষার্থী তার স্বাভাবিক চাহিদা অনুযায়ী শিক্ষকের সাহায্যে প্রোজেক্টটি ঠিক করে তখন তার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হয় ।

(b) পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে প্রচেষ্টা ও ভুলের (Trial and error theory) মাধ্যমে প্রোজেক্টটিকে সঠিকভাবে করার চেষ্টা করে । এই সময় তাকে ভুল সংশোধন করতে হয় , একই কাজের পুনরাবৃত্তি করতে হয় অর্থাৎ অনুশীলনে সূত্রটি কাজে লাগে ।

(c) সক্রিয় কাজের মাধ্যমে উদ্দেশ্য অনুযায়ী প্রোজেক্টটিকে সম্পন্ন করতে পারলে শিক্ষার্থী ওই কাজে আনন্দ পায় এবং ওই বিষয়ে কাজে প্রেরণা দেয় ।

এই কারণেই প্রোজেক্ট পদ্ধতি মনোবিজ্ঞানসম্মত । তাই শিক্ষা পদ্ধতি হিসেবে এর গুরুত্ব অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ।

প্রকল্প পদ্ধতির অসুবিধা :

1. এই পদ্ধতি অত্যন্ত ব্যয়বহুল । তাই আমাদের মতো গরিব দেশে এই পদ্ধতির প্রয়োগ অসুবিধাজনক ।

2. সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থীদের নিয়ে প্রোজেক্ট পরিচালনা সম্ভব । অধিক শিক্ষার্থীদের ( যা আমাদের বিদ্যালয়গুলির বৈশিষ্ট্য ) নিয়ে সার্থকভাবে প্রোজেক্টের রূপ দেওয়া সম্ভব নয় ।

3. প্রায় প্রতিটি প্রোজেক্টই সম্পন্ন হতে সময় লাগে । ফলে এই পদ্ধতি অনুসরণ করে । নির্দিষ্ট সময়ে পাঠ্যসূচি শেষ করা যায় না । আবার কিছু কিছু পাঠ্যাংশ আছে যাকে প্রোজেক্টে রূপ দেওয়া সম্ভব নয় । প্রোজেক্ট পদ্ধতির উপর সম্পূর্ণ নির্ভর করলে ওই অংশগুলি জানার সুযোগ হয় না । প্রোজেক্টের মাধ্যমে শিক্ষার ধারাবাহিকতা যা জ্ঞানের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য তা ঠিক বুঝে উঠতে পারা যায় না ।

4. প্রোজেক্ট পদ্ধতিতে শিক্ষার্থী সবরকমের শিক্ষার সুযোগ পায় না । প্রতিটি শিক্ষার্থীর জন্য বিশেষ ধরনের কাজ থাকে যেমন , কেউ করে হিসাবরক্ষার কাজ , কেউ প্রয়োজনীয় জিনিস সংগ্রহ করে , আবার কেউ উৎপাদিত বস্তু বিক্রি করে । প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নিজের কাজের প্রতি লক্ষ রাখতে হয় । কাজেই প্রোজেক্ট থেকে সে সম্পূর্ণ শিক্ষাগ্রহণ করতে পারে না । এরই মধ্যে যারা চতুর এবং উদ্যোগী তারা অধিকাংশ কাজই সম্পন্ন করে , আর যারা অন্তর্মুখী তারা অনেক ক্ষেত্রে কাজ করে না বা কাজ করার সুযোগ পায় না ।

5. অধিকাংশ প্রোজেক্টেই হাতেকলমে কাজের অংশই বেশি থাকে । তাত্ত্বিক জ্ঞান অর্জনের দিকটি অবহেলিত হয় ।

6. প্রোজেক্ট পদ্ধতিকে সার্থক রূপ দিতে হলে শিক্ষককে যথেষ্ট সক্রিয় এবং সচেতন হতে হবে । প্রতিটি শিক্ষার্থীর প্রতি তাঁর নজর দিতে হবে । শিক্ষার্থীদের ঠিক পথে পরিচালিত করতে হবে । তাদের অসুবিধায় সাহায্য করতে হবে । তাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে । অর্থাৎ শিক্ষককে অত্যধিক পরিশ্রম করতে হয় ।

7. প্রোজেক্ট পদ্ধতি অনুসৃত পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা খুবই কম ।

৪. বিদ্যালয় পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও এই পদ্ধতির অসুবিধা দেখা যায় । যে বিদ্যালয়ে এই পদ্ধতি প্রচলিত নেই সেই বিদ্যালয় থেকে অন্য বিদ্যালয়ে ( যেখানে এই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয় ) গেলে শিক্ষার্থীকে খুবই অসুবিধায় পড়তে হয় ।

9. অনভিজ্ঞতার জন্য তরুণ শিক্ষার্থীরা স্বাধীন মতামত দিতে অনেক ক্ষেত্রে অক্ষম হয় ।

10. শিক্ষার্থীরা এই পদ্ধতিতে তত্ত্বগত জ্ঞানের বদলে তথ্যগত জ্ঞানের অধিকারী হয় । বিজ্ঞানের মৌলিক নীতিগুলি সম্পর্কে তাদের কোনো ধারণা জন্মে না । এই পদ্ধতির বিভিন্ন অসুবিধা থাকা সত্ত্বেও আধুনিক অপ্রত্যক্ষ নির্দেশদান পদ্ধতিগুলির মধ্যে এটি অন্যতম । সুচিন্তিত , সুপরিচালিত ও সুনিয়ন্ত্রিত প্রোজেক্টের মাধ্যমে অনেক কিছুই শেখা যায় এবং পাঠক্রমে কর্মকেন্দ্রিক শিক্ষার প্রবর্তন সম্ভব হয় । শ্রেণিকক্ষে অপ্রত্যক্ষ নির্দেশদান গুরুত্বপূর্ণ । কারণ এই ধরনের নির্দেশদান কেবল ধারণা গঠন ও সংরক্ষণে সাহায্য করে না , মন্তব্যকরণ ও সামান্যীকরণেও সাহায্য করে । এই ধরনের নির্দেশদানে শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভূমিকা থাকায় অর্জিত জ্ঞান আরও অর্থবহ হয়ে ওঠে । এর ফলে পঠিত বিষয়ের সাংগঠনিক দিকটি সুস্পষ্ট হয় । বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবন করা সহজ হয় । গবেষণায় প্রমাণিত যে অপ্রত্যক্ষ নির্দেশদান অধিক পরিমাণে প্রেষণা সৃষ্টি করে এবং সংরক্ষণের পরিমাণও বৃদ্ধি ঘটায় ।

Related posts:

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের জীবন কথা
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী : 2024
চন্দ্রযান-3 : চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণকারী প্রথম দেশ ভারত
GENERAL STUDIES : TEST-2
GENERAL STUDIES : 1
কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স: 8ই সেপ্টেম্বর
'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
তপনের জীবনে তার ছোটো মাসির অবদান আলোচনা করো।
সমান্তরাল আলোকরশ্মিগুচ্ছ বলতে কী বোঝ ?
আলোকরশ্মিগুচ্ছ বলতে কী বোঝায় ? এটি কয়প্রকার ও কী কী ?
একটি সাদা কাগজকে কীভাবে তুমি অস্বচ্ছ অথবা ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যমে পরিণত করবে ?
ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
অস্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
স্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
অপ্রভ বস্তুও কি আলোর উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে?
বিন্দু আলোক - উৎস কীভাবে পাওয়া যেতে পারে ?
বিন্দু আলোক - উৎস ও বিস্তৃত আলোক - উৎস কী ?
অপ্রভ বস্তু কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
স্বপ্নভ বস্তু কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
দিনেরবেলা আমরা ঘরের ভিতর সবকিছু দেখতে পাই , কিন্তু রাত্রিবেলা আলোর অনুপস্থিতিতে কোনো জিনিসই দেখতে পা...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page