নারীশিক্ষার সমস্যা

📚 নারী শিক্ষার সমস্যা :

🧾ভারতবর্ষে নারীশিক্ষার সমস্যাগুলি নিম্নে উল্লেখ করা হল—
( 1 ) শিক্ষাক্ষেত্রে নারী – পুরুষের সমানাধিকারের কথা বলা হলেও তার প্রয়ােগ উল্লেখযােগ্যভাবে হয়নি ।

( 2 ) প্রয়ােজন অনুসারে আঞ্চলিক দূরত্ব বিচার করে মেয়েদের জন্য পৃথক বিদ্যালয় স্থাপন করা সম্ভব হয়নি । বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বালিকা বিদ্যালয়ের অভাব রয়েছে । পৃথক বিদ্যালয় না থাকায় মেয়েদের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও বহুক্ষেত্রে তারা পড়া ছেড়ে দিতে বাধ্য হয় ।

( 3 ) এদেশের অধিকাংশ অভিভাবক কন্যার শিক্ষা অপেক্ষা পুত্রের শিক্ষার উপর অনেক বেশি গুরুত্ব দেন । মেয়েদের শিক্ষা সম্বন্ধে সাধারণ ধারণা যে , মেয়েরা গৃহকর্মের জন্যই উপযুক্ত । তাই মেয়েদের প্রতিভা , সামর্থ্য , ইচ্ছা – অনিচ্ছার মূল্য না দিয়ে শুধুমাত্র বিয়ের উপযােগী করে তােলার জন্য তাদের শিক্ষা দেওয়া হয় । এর ফলে সামর্থ্য সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অনেক মহিলা বিয়ের পর আর শিক্ষা লাভ করতে পারেন না গ্রামাঞ্চলে এবং অনুন্নত জাতি – উপজাতিদের মধ্যে এই প্রবণতা খুবই বেশি ।

( 4 ) গ্রামাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলিতে কোনাে ছাত্রীনিবাস নেই বললেই চলে । ফলে গ্রামাঞ্চলের মেয়েদের শিক্ষাগ্রহণ খুবই অসুবিধাজনক । অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের জন্য পৃথক শৌচাগার নেই , যা তাদের পক্ষে খুবই অসুবিধাজনক ।

( 5 ) পাঠক্রম ত্রুটিপূর্ণ হওয়ায় ছেলে ও মেয়েদের সব সময়ই একই পাঠক্রম অনুসরণ করতে হয় । ফলে অনেক মেয়েই তাদের অর্জিত বিদ্যাকে পরবর্তী জীবনে কাজে লাগাতে পারে না । আবার অনেক ক্ষেত্রে এই ধারণা আছে যে , মেয়েরা অঙ্ক ও বিজ্ঞানে দুর্বল । তাই সামর্থ্য থাকলেও সুযােগের অভাবে বৃত্তি ও কারিগরি শিক্ষার অনেক বিষয় যেমন — ইলেকট্রনিক্স , কম্পিউটার ইত্যাদি পড়বার সুযােগ থেকে মেয়েরা বঞ্চিত হয়।



( 6 ) উচ্চশিক্ষার প্রয়ােজনে সর্বত্র মেয়েদের জন্য কলেজ নেই , সহশিক্ষার সুযােগও অনেক কলেজে নেই ।

( 7) অনেকেই এই মত পােষণ করেন যে , উচ্চশিক্ষিত মেয়েরা সাংসারিক শৃঙ্খলা চান না ।

( 8 ) আর্থিক অনটন নারীশিক্ষার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

( 9 ) অনগ্রসর সম্প্রদায় ও উপজাতিদের মধ্যে রক্ষণশীলতা এবং কুসংস্কার থাকায় ।

( 10 ) মেয়েদের জন্য শিক্ষক – শিক্ষণ কলেজও কম আছে , ফলে যােগ্য শিক্ষণপ্রাপ্ত শিমি অভাব রয়েছে ।



( 11 ) নারীদের উচ্চশিক্ষার জন্য পৃথক পাঠক্রম এখনও তৈরি হয়নি ।

( 12 ) গ্রামাঞলে তাে বটেই , শহরাঞলেও পাঠাগারের অভাবে নারীশিক্ষা ব্যাহত হয়।

( 13 ) বাল্যবিবাহ সম্বন্ধে আইন থাকলেও বহুক্ষেত্রেই আইন মানা হয় না । বিয়ের পর আর পড়াশােনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না প্রায় সব মেয়েদেরই।

( 14 ) গ্রামের অধিকাংশ মহিলা যারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জননী তারা নিরক্ষর । ফলে তারা তাদের মেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার বিষয়ে উৎসাহ দেখান না , সাহায্যও করতে পারেন না । বর্তমান প্রজন্মের মায়েদের সচেতনতার অভাব ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েদের শিক্ষার পথে ভীষণ বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ।

( 15 ) বাসস্থান থেকে বিদ্যালয়ের দূরত্ব নারীশিক্ষার পথকে সুগম না করে সংকুচিত করে তুলছে ।



( 16 ) পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুরুষের তুলনায় নারীর সম্মান ও মর্যাদা অপেক্ষাকৃত কম , তাই নারীশিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে ।

( 17 ) পুরুষের অর্থলিপ্সা ও পণপ্রথাকে কেন্দ্র করে নারীর উপর অত্যাচার ও অবিচার তাদের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যকে নিষ্ঠুরভাবে অবদমিত করে রেখেছে ।

( 18 ) সামাজিক নিরাপত্তার অভাব বােধও নারীশিক্ষার পথকে দুর্গম করে তুলেছে ।

( 19 ) জনশিক্ষার পথে একটি বিশেষ বাধা হল অনুন্নয়ন । মেয়েদের ক্ষেত্রে এই অনুন্নয়ন । খুব বেশি । প্রথম শ্রেণির 100 জন ছাত্রীর মধ্যে 30 জন পঞম শ্রেণি এবং 20 জন অষ্টম শ্রেণিতে পৌঁছায় । অর্থাৎ ৪০ শতাংশ মেয়ে নবম শ্রেণিতে পৌঁছােবার আগে পড়াশােনা ছেড়ে দেয় । আগে যেসব সমস্যার কথা বলা হয়েছে , নারীশিক্ষার সমস্যার বিষয়ে সেই কারণগুলিই এই অনুন্নয়নের জন্য দায়ী ।



প্রশ্ন 79 : নারীশিক্ষার সমস্যা ও এই সমস্যা সমাধানের উপায়গুলি লিখুন ।

উত্তরঃ নারীশিক্ষার ক্ষেত্রে যে সকল সমস্যাগুলি দেখা যায় তা হল

(1) সংবিধানে নারী – পুরুষ সমানাধিকারের কথা বলা হলেও তার প্রয়োগ অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবে দেখা যায় না।

(2) গ্রাম-অঞ্চলে বালিকা বিদ্যালয়ের অভাব রয়েছে । দুরত্বের জন্য অনেক সময়ই দেখা যায় ইচ্ছা থাকলেও মেয়েরা বাইরে অর্থাৎ দূরের কোনো বালিকা বিদ্যালয়ে পড়তে যায় না ।

(3) অধিকাংশ অভিভাবক মনে করেন মেয়েরা গৃহকর্মের জন্যই উপযুক্ত । কন্যা সন্তানের শিক্ষার চেয়ে পুত্র সন্তানের শিক্ষার উপর বেশি নজর দেন ।

(4) গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের জন্য কোনো ছাত্রীনিবাস নেই । মেয়েদের পৃথক শৌচাগার নেই যা তাদের পক্ষে খুবই অসুবিধাজনক ।

(5) ত্রুটিপূর্ণ পাঠ্যক্রম যা অনেক সময়ই মেয়েদের রুচি , সামর্থ্য , আগ্রহ প্রভৃতি আকাঙ্ক্ষা মেটাতে পারে না । বাধ্য হয়ে যে – কোনো একটি বিষয় নিয়ে পড়তে হয় , যা তার পছন্দের বিষয় নাও হতে পারে ।

(6) আবার অনেক ক্ষেত্রে এই ধারণা মেয়েরা অঙ্কে , বিজ্ঞানে দুর্বল । তাই সামর্থ থাকলেও সুযোগের অভাব থাকে ।

(7) মেয়েদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হতে দিতে অনেক সংকীর্ণ মানুষের অভিমত হল উচ্চশিক্ষিত মেয়েরা সাংসারিক শৃঙ্খলা মানতে চান না ।

(8) অনুন্নত জাতি – উপজাতিদের মধ্যে রক্ষণশীলতা ও কুসংস্কার থাকায় নারী শিক্ষার পথে বাধা সৃষ্টি করছে ।

(9) উচ্চ – শিক্ষার জন্য সর্বত্র মেয়েদের জন্য কলেজ নেই , সহ – শিক্ষারও সুযোগ অনেক কলেজে নেই ।

(10) মেয়েদের জন্য পৃথকভাবে শিক্ষক শিক্ষণের কলেজ অনেক কম তাই শিক্ষণ প্রাপ্ত শিক্ষিকার অভাব রয়েছে ।

(11) বাল্যবিবাহ নারীশিক্ষাকে ব্যাহত করে।

(12) নিরক্ষর মহিলা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জননী । ফলে তারা তাদের মেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে নিরুৎসাহ থাকবে ।

(13) পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা নারীশিক্ষার বাধা ।

(14) পিতৃতান্ত্রিক সমাজে পুত্রই কুল রক্ষা করে , কন্যা সন্তান অন্যের সংসারে যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হয় । তাই পিতৃকুল তার শিক্ষার তেমন দায়িত্ব নিতে চায় না ।

(15) নিরাপত্তার অভাব নারীদের চলার পথে প্রধান বাধা যা তার শিক্ষাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে ।

(16) এই সমাজব্যবস্থায় পুরুষের তুলনায় নারীর সম্মান ও মর্যাদা অনেক অংশে কম । যা শুধু নারী শিক্ষা ব্যাহত করছে তাই নয় , কন্যা সন্তান জন্ম নেওয়াকেও ব্যাহত করছে ।

(18) পশ্চাৎপদ সমাজব্যবস্থা ও বন্ধ্যা মানসিকতা নারী শিক্ষার অগ্রগতিকে রুদ্ধ করে ।

(17) নারী শিক্ষার পথে একটি বড়ো বাধা হল অনুন্নয়ন , যা সার্বিক জনশিক্ষাকেও ব্যাহত করে । মেয়েদের ক্ষেত্রে এই অনুন্নয়ন অনেক বেশি হয় । আর এই অনুন্নয়নের কারণ হল আর্থসামাজিক ও পূর্বে বর্ণিত কারণগুলি ।

নারীশিক্ষার সমস্যা সমাধানের উপায়গুলি হল —

(1) প্রয়োজন অনুসারে আঞ্চলিক দূরত্বের বিচারে বালিকা বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে।

(2) গ্রামাঞ্চলে ছাত্রীদের জন্য হোস্টেলের ব্যবস্থা করতে হবে ।

(3) মেয়েদের অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক শিক্ষার উপর অধিক গুরুত্ব আরোপ করতে হবে ।

(4) মেয়েদের জন্য পৃথক বিদ্যালয় স্থাপন করতে হবে ।

(5) মেয়েদের জন্য আংশিক সময়ের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে । যারা সাংসারিক কাজকর্মের কারণে পূর্ণ সময়ের জন্য শিক্ষা গ্রহণ করতে পারছেন না ।

(6) ছেলেমেয়েদের যৌথ বিদ্যালয়গুলিতে School mother নিয়োগ করতে হবে । কারণ অনেক সময় দেখা যায় যে যেসব বিদ্যালয়ে ছেলেমেয়েরা একসাথে পড়ে সেখানে যদি মহিলা শিক্ষিকা থাকে তাহলে অভিভাবকরা কন্যাকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে আগ্রহী হবেন ।

(7) দুর্গম অঞ্চলে যেসব শিক্ষার্থী যোগদান করবে তাদের বিশেষভাবে অর্থনৈতিক বা অন্যান্য সুযোগসুবিধা দেওয়া উচিত ।

(8) বিদ্যালয়ের নিকটে শিক্ষিকাদের থাকার ব্যবস্থা করা দরকার ।

(9) গ্রামের জনসাধারণ বালিকাদের বিদ্যালয়ে যেতে উৎসাহিত করবে সেজন্য ভিলেজ কমিউনিটি তৈরি করা ।

(10) নারী শিক্ষায় পাঠ্যক্রমে কিছু পরিবর্তন করা দরকার , মাতৃত্বের বৈশিষ্ট্য , যেমন— শিশুদের যত্ন , গৃহ – অর্থনীতি , শিশুদের লালনপালন ইত্যাদি বালিকাদের শিক্ষার বিষয় পাঠ্যক্রমে থাকবে ।

(11) কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলিকে নারীশিক্ষা প্রসারের জন্য উৎসাহিত করবে ।

(12) নারীদের কর্মক্ষমতা বাড়িয়ে তোলার জন্য বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে হবে ।

(13) সামাজিক শিক্ষার মাধ্যমে সমাজের বয়স্ক নিরক্ষর মহিলাদের সাক্ষর করে তুলতে হবে , যারা পরোক্ষভাবে নারীশিক্ষার পথে অন্তরায় ।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page