দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

💠 দ্বিজেন্দ্রলাল রায়

💠 জন্ম পরিচয় : –

১৮৬৩ খ্রীস্টাব্দের ১৯ শে জুলাই কৃষ্ণনগরের প্রসিদ্ধ দেওয়ান বংশে ইনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা ছিলেন কার্তিকেয়চন্দ্র রায় । চরিত্রমাহাত্ম্যে ও বাংলা – ইংরাজী – ফার্সী ভাষায় পারদর্শিতার জন্য কার্তিকেয়চন্দ্র বিদ্যাসাগর – মধুসূদন – দীনবন্ধু – বঙ্কিমচন্দ্র প্রমূখ ব্যক্তিত্বের বন্ধুত্ব লাভ করেন । প্রেসীডেন্সী কলেজ থেকে ইংরাজী সাহিত্যে দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এম. এ. পাশ করার পর ১৮৮৪ খ্রীষ্টাব্দে কৃষিবিদ্যা শিচ্ষার জন্য ইংল্যান্ডে যান । সেখানে বিদেশী সংগীত চর্চার সাথে সাথে শেলী – কীটসদের রচনাপাঠে মনোনিবেশ করেন ।

💠 বাংলা সাহিত্যে অবদান : –

দ্বিজেন্দ্রলাল বাংলা সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটে কবি এবং নাট্যকার রূপে । বাংলা কবিতায় আনতে চেয়েছিলেন ইন্দ্রিয়াবেগের প্রত্যক্ষ স্ফূর্তির সঙ্গে সামাজিক বাস্তববুদ্ধি । বাংলা কবিতায় ইংরেজী শব্দ বসিয়ে মৌখিক রীতি প্রবর্তনেও এনার কৃতিত্ব দেখা যায় ।
বঙ্গ রঙ্গমঞ্চের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত না হলেও জন-গন-মন হরনে সক্ষম হন নাট্যকাররূপে । এইভাবে প্রহসন , তারপর পৌরাণিক , ঐতিহাসিক ও সামাজিক নাটক রচনায় দ্বিজেন্দ্রলালের নাট্যপ্রতিভা বিকশিত হয় ।

✅ কাব্যগ্রন্থ ও তার বিষয় : –

“আর্যগাথা” (১ম – ১৮৮২, ২য় – ১৮৯৩) – এই কাব্যের ১ম ভাগে আছে ঈশ্বর – প্রকৃতি আত্মানুভূতর বিষয়ে সমৃদ্ধ । আর ২য় ভাগে আছে মানবপ্রেমের প্রকাশ ।
“The Lyrics of Ind” (১৮৮৬) – এই কাব্যের মধ্য দিয়ে ইংরেজী ভাষার কাব্যভাবনার মিলনসূত্র রচনা করতে চেয়েছিলেন ।
“আষাঢ়ে” (১৮৯৯) ,- এই কাব্যটি ইংরেজী ব্যঙ্গকাব্যের অনুসরণে রচিত ।
“হাসির গান” (১৯০০) – এই কাব্যটিও বারহামের “Ingoldsby Legend’s” এর দ্বারা অনুভাবিত । কাব্যটির মধ্য দিয়ে বাঙালী সমাজে একটা ভাবের বিপ্লব ঘটিয়েছিল ।
“মন্দ্র” (১৯০২) – এই কাব্যে দেখা যায় গীতিকার এবং তার্কিক কবি-চিত্তে দুই স্ববিরোধী সত্ত্বার অবস্থান ।
“আলেখ্য” (১৯০৭) – এর একদিকে আছে স্ত্রী বিয়োগের অভিজ্ঞতা , অন্যদিকে আছে নতুন সমাজভাবনা ও গনতান্ত্রিক চেতনা ।
“ত্রিবেণী” (১৯১২) – কাব্যটি স্থির গম্ভীর স্মৃতির বেদনায় পূর্ণ । এখানে যেমন আছে অতীত স্মৃতির পর্যালোচনা , তেমনি আছে জগৎ ও জবনের নতুনতর অর্থের তৃষ্ণা ।

কাব্য – সংক্রান্ত প্রবন্ধ :

“কাব্যের অভিব্যক্তি” ( ১৩১৩, কার্ত্তিক ‘প্রবাসী’ ) ,
“কাব্যের উপভোগ” ( ১৩১৪, মাঘ ‘বঙ্গদর্শন’ ) ,
“কাব্যের নীতি” ( ১৩১৬, জ্যৈষ্ঠ ‘সাহিত্য’ ) ।

✅ প্রহসন ও তার বিষয় :

“এক ঘরে” (১৮৮৯) – ১৮৮৭ খ্রীস্টাব্দে বিলেত থেকে দেশে ফেরাল পর বিনা প্রায়শ্চিত্তে হিন্দুসমাজ তাঁকে গ্রহণে অসম্মত হয় । সমাজের এই অন্যায় ব্যবহারের প্রতিক্রিয়ায় এই রচনা প্রকাশিত হয় ।
“কল্কি অবতার” (১৮৯৫) – এ নব্যহিন্দু , ব্রাহ্ম , রক্ষণশীল , পন্ডিত ও বিলাত-ফেরত – এই পচ সম্প্রদায়ের প্রতি ব্যঙ্গবান নিক্ষিপ্ত।
“বিরহ” (১৮৯৭) – এতে আখ্যান বিন্যাস যথেষ্ট জটিল । সামাজিক বিদ্রুপ অনেক কম ।
“ত্র্যহস্পর্শ” (১৯০১) – এটী তেমন সার্থক হতে পারেনি ।
“প্রায়শ্চিত্ত” (১৯০২) – এতে আছে বিলাত ফেরত সমাজের অর্থলোলুপতা – কৃত্রিমতা – বিলাসিতা র বিরুদ্ধে বিদ্রুপ বর্ষণ ।
“পুনর্জন্ম” (১৯১১) – এতে এক কৃপন , নির্মম ও স্বার্থপর সুদখোরের হাস্যকর পরিণতি দেখানো হয়েছে ।
“আনন্দ-বিদায়” (১৯১২) – রবীন্দ্র বিরোধিতার এক উজ্জ্বল স্মৃতিখন্ড আছে এই প্রহসনে ।

নাটক

✅ পৌরাণিক নাটক ও তার বিষয় :

“পাষাণী” (১৯০০) – এতে অভিশাপের প্রভাবে অহল্যার পাষাণ হওয়ার কাহিনী পরিব্যপ্ত ।
“সীতা” (১৯০৮) – এর কাহিনী ভবভূতির ‘উওর রামচরিত’ এবং বাল্মীকি রামায়ণের উওরকান্ড থেকে গৃহীত । এতে রাম ও সীতার অনেক উক্তি বিচ্ছিন্ন গীতিকবিতা বলে ভ্রম হওয়া অস্বাভাবিক নয় ।
“ভীষ্ম” (১৯১৪) – এই নাটকটি মহাভারতের সর্বাংশে অনুকরণ নয় ।

✅ ইতিহাসাশ্রিত রোমান্টিক কাব্য ও তার বিষয় :

“তারাবাঈ” (১৯০৩) – মোগল – রাজপুত সম্পর্ক অবলম্বন করে এই নাটক রচিত ।
“সোরাব রুস্তম” (১৯০৮) – ফিদৌসির ‘শাহনামা’ গ্রন্থটি এর মূল উৎস । এখানে আফ্রিদ চরিত্রে দেশপ্রেমের দিকটি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে ।

✅ ঐতিহাসিক নাটক ও তার বিষয় :

“রাণা প্রতাপসিংহ” (১৯০৫)
“দুর্গাদাস” (১৯০৬) ,
“মেবার-পতন” (১৯০৮) – এই তিনটি নাটকে রাজপুতদের বীরত্ব , আত্মমর্যাদা ও দেশপ্রেমের ছবি পরিস্ফুট হয়েছে ।
“নূরজাহান”(১৯০৮) “সাজাহান” (১৯০৯) – এই নাটকদ্বয়ে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর এবং সিজাহানের পরিবারের কলঙ্কের ঘটনা বর্ণিত আছে ।
“চন্দ্রগুপ্ত” (১৯১১) , “সিংহলবিজয়” (১৯১৫) – প্রাচীন ভারতের হিন্দুযুগ থেকে বিষয় নির্বাচন করে এই দুই নাটক দ্বিজেন্দ্রলাল রচনা করেন ।

✅ সামাজিক নাটক :

“পরপারে” (১৯১২) ,
“বঙ্গনারী” (১৯১৫) ।

✅ মূল্যায়ন :

তাঁর রচনার মধ্যে সবসময় একটা নতুনত্বের সন্ধান পাওয়া গেছে । তিনি কাব্যের মধ্য দিয়ে গদ্যময় সংলাপ প্রচলন করেছেন । নাটকের মধ্যে আধ্যাত্মিকতা ও অলৌকিকতা বর্জন করে আধুনিক জীবনভাবনার প্রকাশ করেছেন । তাই , বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে কবি এবং নাট্যকার হিসেবে দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের ব্যক্তিত্বকে অবিস্মরণীয় বলা যেতেই পারে ।

Related posts:

তোত্তে- চানের আডভেঞ্চার - তেৎসুকো কুরোয়ানাগি
লিঙ্গ : পুংলিঙ্গ , স্ত্রীলিঙ্গ এবং ক্লীবলিঙ্গ ।
ভাষা শিক্ষণের নৈপুণ্যতা
আদর্শ বলা / আদর্শ কথন
স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির সঠিক উচ্চারণ
যুক্তবর্ণের উচ্চারণ : উষ্ট্র , রাষ্ট্র , ট্রেন , চিত্ত , বিত্ত , মত্ত , যুক্ত , রক্ত , শক্ত, যত্ন , ...
যুক্তবর্ণের উচ্চারণ : দ্বন্দ্ব , বিদ্বান , বিদ্বেষ , বদ্ধ , উদ্ধার
অনুলিখন vs শ্রুতিলিখন
কীভাবে শ্রুতিলিখন শ্রেণিকক্ষে শেখানাে যায় ?
বলা , পড়া ও লেখার ক্ষেত্রে যতিচিহ্নের যথাযথ ব্যবহার রীতি
বাংলা ব্যাকরণের কিছু প্রশ্নোত্তর
বলা , পড়া ও লেখার ক্ষেত্রে যতিচিহ্নের যথাযথ ব্যবহার রীতি
কীভাবে শ্রুতিলিখন শ্রেণিকক্ষে শেখানাে যায় ?
অনুলিখন vs শ্রুতিলিখন
কীভাবে হাতের লেখা শেখানাে হবে
ভালাে হস্তাক্ষরের বৈশিষ্ট্য
হাতের লেখা অনুশীলনের উদ্দেশ্য
স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির সঠিক উচ্চারণ
ভালাে কথাবার্তা শেখানাের কৌশল
আদর্শ বলা / আদর্শ কথন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page