এক নজরে : মিশরীয় সভ্যতা

💠 মিশরীয় সভ্যতা সময়কাল :

● প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতার বিস্তৃতিকাল খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০-৫২৫ পর্যন্ত ।

● আফ্রিকা মহাদেশের উত্তর – পূর্ব অংশ যা আমাদের কাছে পরিচিত ইজিপ্ট বা মিশর নামে ।

● খ্রিস্টপূর্ব ৪০০০ অব্দে মিশরে প্রথম সাম্রাজ্যের উদ্ভব ঘটে । যার একটি ছিল উত্তর মিশর ( নিম্ন মিশর ) অপরটি ছিল দক্ষিণ মিশর ( উচ্চ মিশর ) ।

● খ্রিস্টপূর্ব ৫০০০ থেকে ৩২০০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত সময়ে নীলনদের অববাহিকায় একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয় । সে সময়টা প্রাচীন মিশরের ইতিহাসে প্রাক – রাজবংশীয় যুগ বলে পরিচিত । এ সময় থেকে মিশর প্রাচীন সভ্যতায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে শুরু করে ।

● প্রথম রাজবংশের শাসন আমল শুরু হয় খ্রিস্টপূর্ব ৩২০০ অব্দ থেকে । তখন থেকে মিশরের ঐতিহাসিক যুগের শুরু । একই সময়ে নিম্ন ও উচ্চ মিশরকে একত্রিত করে ‘ নারমার ’ বা ‘ মেনেস ‘ একাধারে মিশরের প্রথম নরপতি এবং পুরােহিত হন । তিনি প্রথম ফারাও এর মর্যাদাও লাভ করেন । এরপর থেকে ফারওদের অধীনে মিশর প্রাচীন বিশ্বসভ্যতার অগ্রগতিতে একের পর এক উল্লেখযােগ্য অবদান রাখতে শুরু করে ।



■ রাষ্ট্র ও সমাজ :

● প্রাক – রাজবংশীয় যুগে মিশর কতগুলাে ছােটো ছােটো নগর রাষ্ট্রে বিভক্ত ছিল । এগুলােকে ‘ নােম ‘ বলা হতাে ।

● মিশরের প্রথম রাজা বা ফারাও – এর ( মেনেস বা নারমার ) অধিনে ঐক্যবদ্ধ মিশরের রাজধানী ছিল দক্ষিণ মিশরের — মেম্ফিস ।

● মিশরীয় ‘ পের-ও ‘ শব্দ থেকে ফারাও শব্দের জন্ম । ফারাও-রা ছিলেন অত্যন্ত ক্ষমতাশালী । তারা নিজেদেরকে সূর্য দেবতার বংশধর মনে করতেন । ফারাও পদটি ছিল বংশানুক্রমিক । অর্থাৎ ফারাওয়ের ছেলে হতাে উত্তরাধিকার সূত্রে ফারাও ।

● পেশার উপর ভিত্তি করে মিশরের সমাজের মানুষকে কয়েকটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায় ।
যেমন : রাজপরিবার , পুরােহিত , অভিজাত , লিপিকার , ব্যবসায়ী , শিল্পী , কৃষক ও ভূমিদাস ।


● মিশরের অর্থনীতি মূলত ছিল কৃষি নির্ভর । নীল নদের তীরে গড়ে তােলা সভ্যতার মানুষ অর্থাৎ মিশরীয়রা বন্যার সময় বাধ তৈরি করে ফসল রক্ষা করত । আবার শুষ্ক মরসুমে ফসলের ক্ষেতে জল দেওয়ার জন্য খাল কেটে গড়ে তুলেছিল সেচ ব্যবস্থা ।

● মিশরেই প্রথম সরকারি ব্যবস্থায় চাষাবাদ চালু হয় । কৃষিনির্ভর মিশরের উৎপাদিত ফসলের মধ্যে উল্লেখযােগ্য ছিল গম , যব , তুলা , পেঁয়াজ , পিচ ইত্যাদি ।

● ব্যবসায় – বাণিজ্যেও মিশর ছিল অগ্রগামী । মিশরে উৎপাদিত গম , লিনেন কাপড় ও মাটির পাত্র ক্রিট দ্বীপ , ফিনিশিয়া , ফিলিস্তিন ও সিরিয়ায় রপ্তানি হতাে ।

● বিভিন্ন দেশ থেকে মিশরীয়রা স্বর্ণ , রৌপ্য , হাতির দাঁত , কাঠ ইত্যাদি আমদানি করতাে ।



■ নীল নদ :

● মিশরের নীল নদের উৎপত্তি আফ্রিকার লেক ভিক্টোরিয়া থেকে । সেখান থেকে নদটি নানা দেশ হয়ে মিশরের মধ্য দিয়ে ভূ-মধ্যসাগরে এসে পড়েছে ।

● ইতিহাসের জনক হেরােডােটাস ‘ যথার্থই বলেছেন – “ মিশর নীল নদের দান ।”

● নীল নদ না থাকলে মিশর মরুভূমিতে পরিণত হতাে । প্রাচীন কালে প্রতিবছর নীল নদে বন্যা হতাে । বন্যার পর জল সরে গেলে দুই তীরে পলিমাটি পড়ে জমি উর্বর হয়ে যেতাে । জমে থাকা পলিমাটিতে জন্মাতাে নানা ধরনের ফসল ।



■ মিশরীয়দের ধর্ম বিশ্বাস :

● সম্ভবত প্রাচীন মিশরীয়দের মতাে অন্য কোনাে জাতি জীবনের সকল ক্ষেত্রে এতটা ধর্মীয় নিয়ম – কানুন অনুশাসন দ্বারা প্রভাবিত ছিল না । সে কারণে মানবসভ্যতার অনেক ধ্যানধারণা , রীতি নীতি , আচার – অনুষ্ঠানের জন্ম প্রাচীন মিশরে ।

● তারা জড়বস্তুর পূজা করত , মূর্তি পূজা করত , আবার জীবজন্ত্রর পূজাও করত । বিভিন্ন সময়ে তাদের ধর্মবিশ্বাসের পরিবর্তন ঘটেছে ।

● মিশরীয়দের ধারণা ছিল — সূর্যদেবতা ‘ রে ’ বা ‘ আমন রে ‘ এবং প্রাকৃতিক শক্তি , শস্য ও নীলনদের দেবতা ‘ ওসিরিস ‘ মিলিতভাবে সমগ্র পৃথিবী পরিচালিত করেন । তবে তাদের সূর্যদেবতা ‘ রে ‘ – এর গুরুত্ব ছিল অনেক বেশি ।

● মিশরীয়রা মনে করত মৃত ব্যক্তি আবার একদিন বেঁচে উঠবে । সে কারণে দেহকে তাজা রাখার জন্য তারা মৃতদেহ সংরক্ষণ করত । এই পদ্ধতিকে বলা হয় — মমি ।

● এই চিন্তা থেকে মমিকে রক্ষার জন্য তারা পিরামিড তৈরি করেছিল ।

● ফারাওরা ঈশ্বরের প্রতিনিধি হিসেবে দেশ শাসন করতেন । তাঁরা ছিলেন প্রধান পুরােহিত এবং অন্যান্য পুরােহিতদেরও তাঁরা নিয়ােগ করতেন ।




■ শিল্প :

● মিশরের চিত্রশিল্পও গড়ে উঠেছিল ধর্মীয় বিশ্বাস থেকে । মিশরীয়দের চিত্রকলা বিশেষভাবে বৈচিত্রপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ ।

● মিশরের চিত্রশিল্পের সূচনা হয় সমাধি আর মন্দিরের দেয়াল সাজাতে গিয়ে । তাদের প্রিয় রং ছিল সাদা – কালাে ।

● সমাধি , পিরামিড , মন্দির , প্রাসাদ , প্রমােদ কানন , সাধারণ ঘর – বাড়ির দেয়ালে মিশরীয় চিত্রশিল্পীরা অসাধারণ ছবি এঁকেছেন । এসব ছবির মধ্যে মিশরের রাজনৈতিক , ধর্মীয় , সামাজিক ও পারিবারিক জীবনের কাহিনী ফুটে উঠেছে ।

● কারুশিল্পেও প্রাচীন মিশরীয় শিল্পীরা অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছিলেন । আসবাবপত্র , মৃৎপাত্র , সােনা , রূপা , মূল্যবান পাথরে খচিত তৈজসপত্র , অলঙ্কার , মমির মুখােশ , দৈনন্দিন ব্যবহার্য জিনিসপত্র , হাতির দাঁত ও ধাতুর দ্রব্যাদি মিশরীয় কারুশিল্পের অসাধারণ দক্ষতার প্রমাণ বহন করে ।



■ ভাস্কর্য :

● প্রাচীন বিশ্বসভ্যতায় মিশরীয়দের মতাে ভাস্কর্য শিল্পে – অসাধারণ প্রতিভার ছাপ আর কেউ রাখতে সক্ষম হয়নি । ব্যাপকতা , বৈচিত্র এবং ধর্মীয় ভাবধারায় প্রভাবিত বিশাল আকারের পাথরের মূর্তিগুলাে ভাস্কর্য শিল্পে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ বহন করে ।

● প্রতিটি ভাস্কর্য , মানুষ অথবা জীবজন্তু সবই ধর্মীয় ভাবধারা , আচার অনুষ্ঠান , মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত ছিল । প্রতিটি শিল্পই আসলে ধর্মীয় শিল্পকলা ।

● সর্বশ্রেষ্ঠ ভাস্কর্য হচ্ছে গির্জার অতুলনীয় স্ফিংস / স্ফিংক্স । স্ফিংস / স্ফিংক্স হচ্ছে এমন একটি কাল্পনিক মূর্তি , যার দেহটা সিংহের মতাে , কিন্তু মুখ মানুষের ।

● মিশরের সবচেয়ে বড় পিরামিডটি হচ্ছে ফারাও খুফুর পিরামিড । মন্দিরগুলােতে মিশরীয় ভাস্কর্য স্থাপত্যের অপূর্ব নিদর্শন প্রতিফলিত হয়েছে ।


■ লিখনপদ্ধতি ও কাগজ আবিষ্কার :

● মিশরীয় সভ্যতার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল লিপি বা অক্ষর আবিষ্কার । নগর সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মিশরীয় লিখন পদ্ধতির উদ্ভব ঘটে । পাঁচ হাজার বছর পূর্বে তারা সর্বপ্রথম ২৪ টি ব্যঞ্জনবর্ণের বর্ণমালা আবিষ্কার করতে সক্ষম হয় ।

● প্রথম দিকে ছবি এঁকে তারা মনের ভাব প্রকাশ করত । এই লিখন পদ্ধতির নাম ছিল চিত্রলিপি । এই চিত্রলিপিকে বলা হয় ‘ হায়ারােগ্লিফিক ‘ বা পবিত্র অক্ষর ।

● মিশরীয়রা নলখাগড়া জাতীয় গাছের মন্ড থেকে কাগজ বানাতে শেখে । পরে এই কাগজের উপর তারা লিখতে শুরু করে । গ্রিকরা এই কাগজের নাম দেয় ‘ প্যাপিরাস ‘ । যে শব্দ থেকে ইংরেজি ‘ পেপার ‘ শব্দের উৎপত্তি ।

● এখানে উল্লেখ্য নেপােলিয়ান বােনাপার্টের মিশর জয়ের সময় একটি পাথর আবিষ্কৃত হয় , রসেটা স্টোন নামে পরিচিত ।

● এতে গ্রিক এবং ‘ হায়ারােগ্লিফিক ‘ ভাষায় অনেক লেখা ছিল ; যা থেকে প্রাচীন মিশরের অনেক তথ্য জানা যায় ।



■ বিজ্ঞান :

● মিশরীয় সভ্যতা ছিল কৃষিনির্ভর । সে কারণে নীল নদের প্লাবন , নাব্যতা , জল প্রবাহের মাপ , জোয়ারভাটা ইত্যাদি ছাড়াও জমির মাপ তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ।

● এসবের সঙ্গে জ্যোতিষশাস্ত্র ও অংক শাস্ত্রের ছিল গভীর যােগাযােগ । ফলে এ দুটি বিদ্যা তারা আয়ত্ত করেছিল প্রয়ােজনের তাগিদে । তারা অংক শাস্ত্রের দুটি শাখা- জ্যামিতি এবং পাটিগণিতেরও প্রচলন করে । মিশরীয় সভ্যতার মানুষ যােগ , বিয়ােগ ও ভাগের ব্যবহার জানত ( তারা ভাগের ব্যবহার জানত কিনা নিয়ে মতানৈক্য রয়েছে) ।

● খ্রিস্টপূর্ব ৪২০০ অব্দে তারা পৃথিবীতে প্রথম সৌর পঞ্জিকা আবিষ্কার করে । ৩৬৫ দিনে বছর হিসাবের আবিষ্কারকও তারা । প্রাচীন মিশরের অধিবাসীরা সময় নির্ধারণের জন্য সূর্য ঘড়ি , ছায়াঘড়ি , জলঘড়ি আবিষ্কার করে ।

● ধর্মের কারণে মিশরীয়রা বিজ্ঞানচর্চায় আগ্রহী ছিল । চিকিৎসাশাস্ত্রেও প্রাচীন মিশরীয়রা বিশেষ অগ্রগতি লাভ করেছিল । তারা চোখ , দাঁত , পেটের রােগ নির্ণয় করতে জানত ।

● অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে চিকিৎসা করার বিদ্যাও তাদের জানা ছিল । তারা হাড় জোড়া লাগানাে , হৃৎপিন্ডের গতি এবং নাড়ির স্পন্দন নির্ণয় করতে পারত ।

● চিকিৎসা শাস্ত্রে মিশরীয়রাই সর্বপ্রথম ‘মেটেরিয়া মেডিকা ’ বা ঔষুধের তালিকা প্রণয়নে সক্ষম হয় ।

● মিশরীয়রা দর্শন , সাহিত্য চর্চাও করত । তাদের রচনায় দুঃখ হতাশার কোন প্রকাশ ছিল না । তারা আশাবাদী ছিল । তাদের লেখায় সব সময়ই আনন্দের প্রকাশ দেখা গেছে ।

Related posts:

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের জীবন কথা
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী : 2024
চন্দ্রযান-3 : চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণকারী প্রথম দেশ ভারত
GENERAL STUDIES : TEST-2
GENERAL STUDIES : 1
কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স: 8ই সেপ্টেম্বর
'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
তপনের জীবনে তার ছোটো মাসির অবদান আলোচনা করো।
সমান্তরাল আলোকরশ্মিগুচ্ছ বলতে কী বোঝ ?
আলোকরশ্মিগুচ্ছ বলতে কী বোঝায় ? এটি কয়প্রকার ও কী কী ?
একটি সাদা কাগজকে কীভাবে তুমি অস্বচ্ছ অথবা ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যমে পরিণত করবে ?
ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
অস্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
স্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
অপ্রভ বস্তুও কি আলোর উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে?
বিন্দু আলোক - উৎস কীভাবে পাওয়া যেতে পারে ?
বিন্দু আলোক - উৎস ও বিস্তৃত আলোক - উৎস কী ?
অপ্রভ বস্তু কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
স্বপ্নভ বস্তু কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
দিনেরবেলা আমরা ঘরের ভিতর সবকিছু দেখতে পাই , কিন্তু রাত্রিবেলা আলোর অনুপস্থিতিতে কোনো জিনিসই দেখতে পা...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page