বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়

💠 বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় 💠

✅ বাংলা কথাসাহিত্যের জগতে যে তিন ত্রয়ী বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম উল্লিখিত তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় ( জন্ম : -১২ সেপ্টেম্বর , ১৮৯৪ খ্রি : এবং মৃত্যু : -১ লা নভেম্বর , ১৯৫০ খ্রি 🙂 । তাঁর মতাে এমন রােমান্টিক , প্রকৃতি প্রেমিক মানুষ বাংলা সাহিত্যে প্রায় অমিল । রবীন্দ্রপরবর্তী কথা সাহিত্যের ধারায় তিনি ছিলেন অন্যতম ।

✅ বঙ্কিমচন্দ্র , রবীন্দ্রনাথ , শরৎচন্দ্রের পর বাংলা সাহিত্যের প্রাণ সঞ্চার করেছিলেন তিন বন্দ্যোপাধ্যায় । বিভূতিভূষণের সাহিত্যে এসেছে প্রকৃতি ও মানুষ । তারাশঙ্কর রচনা করেছেন রাঢ় বাংলার জনজীবনকে নিয়ে । আর মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাহিত্যে ফুটে উঠেছে বিজ্ঞান মনষ্কতা ও মার্ক্সীয় ভাবনা ।

✅ কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় জন্মগ্রহন করেন ১৮৯৪ এ , হালিশহর , কাঁচড়াপাড়ায় । তাঁর ছােটো থেকে বড়াে হওয়া , চাকরি জীবনে পাওয়া অভিজ্ঞতার ছাপ খুঁজে পাওয়া যায় তাঁর রচনায় ।

💠 উপন্যাস :

✅ পথের পাঁচালী : – বাংলা সাহিত্যে বিভূতিভূষণের আবির্ভাব পথের পাঁচালী উপন্যাসের মধ্য দিয়ে । তাঁর লেখক স্বভাবের বৈশিষ্ট্য হল তিনি ছিলেন সত্য ও সুন্দরের সাধক । “পথের পাঁচালী” তে একটি শিশু মনের সুন্দর ছবি লেখক ফুটিয়ে তুলেছেন । পথের পাঁচালী প্রকাশিত হয় ১৩৩৬ বঙ্গাব্দে , মহালয়ার দিন , ১৯২৯ খ্রি :। পথের পাঁচালী ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয় “বিচিত্রা ” পত্রিকায় । বইটির বিজ্ঞাপনে লেখা হয়েছিল – ” প্রকৃতির স্বাধীন আবহাওয়া একটি শিশুচিত্তকে কীভাবে সংসার সংগ্রামের উপযােগী করিয়া তুলিতেছে তাহারই বিচিত্র ইতিহাস অপরুপ ভঙ্গিতে বলা হইয়াছে । ” ভাগলপুরে অবস্থানকালে লেখক এই উপন্যাস রচনা করেন । পথের পাঁচালী ( ১৯২৯ ) উৎসর্গ করা হয়েছে তাঁর পিতৃদেবকে । এই উপন্যাসটির পটভূমি গ্রামবাংলার প্রকৃতি । নিজেই প্রসঙ্গে বলেছিলেন “পথের পাঁচালীর গ্রাম্য চিত্র গুলি সবই আমার স্বগ্রাম ব্যারাকপুর ।” ইংরেজি , ফরাসি , জার্মান, জাপানি প্রভৃতি ভাষায় অনূদিত হয়েছে উপন্যাসটি অপু ও দুর্গার শৈশব কৈশােরের দেহমনের রূপকথা। উপন্যাসের তিনটি অংশ — বল্লালী বলাই, আম আঁটির ভেঁপু এবং অক্রুর সংবাদ ।


✅ পথের পাঁচালীর মূল চরিত্র হল — অপু ও দুর্গা । এদেশে শিশু মনােস্ততত্ত্বের প্রথম পরিচয় ফুটে ওঠে আলােচ্য রচনায় ।


✅ রবীন্দ্রনাথ ‘ পরিচয় ‘ পত্রিকায় পথের পাঁচালী নিয়ে তাঁর অভিমত ব্যক্ত করেন । ‘পথের পাঁচালি’ নিয়ে সত্যজিৎ রায় তৈরী করেছিলেন তাঁর বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র ।


✅ অপরাজিতা : এটি প্রকাশিত হয় ১৯৩২ খ্রিষ্টাব্দে। পথের পাঁচালী যেখানে শেষ অপরাজিতার শুরু সেখানে । অপু এখানে তরুণ । ১৯৩২ খ্রিঃ রচিত এই উপন্যাসটি উৎসর্গ করা হয়েছে তাঁর মাতৃদেবীকে । পথের পাঁচালীর অপুর অপরাজিত জীবনের কাহিনী এই ‘অপরাজিতা’ উপন্যাস ।


✅ দৃষ্টিপ্রদীপ : এটির প্রকাশিত হয় ১৯৩৫ এ । চরিত্ররা হল — জিতু , মালতী । উপন্যাসে প্রেমের উপাখ্যান , ব্যর্থ প্রেমের স্মৃতি , প্রকৃতি ভাবনা বড়াে হয়ে উঠেছে । শরৎচন্দ্রের ” শ্রীকান্ত ” এর প্রভাব এতে দেখা যায় ।


✅ আরণ্যক : বাংলা সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ উপন্যাসগুলির মধ্যে অন্যতম ‘আরণ্যক’ । আরণ্যক ধারাবাহিক ভাবে ‘প্রবাসী ‘ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় । অরণ্য ও অরণ্যের সঙ্গে সংযুক্ত আদিম গন্ধবাহী নানা জাতির মানুষ এই উপন্যাসের পটভূমি রচনা করেছে । ১৯৩৯ খ্রিঃ রচিত এই উপন্যাসটি কবিপত্নী গৌরী দেবীকে উৎসর্গ করা হয়েছে । বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ উপন্যাস । উত্তরবিহারের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ ও তাদের আরণ্যক প্রকৃতির কাহিনী ও জীবনযাপনের মর্মগাঁথা এই উপন্যাস । বিভূতিভূষণের কাব্যমনস্কতার পরিচয় পাওয়া যায় এই উপন্যাসে । অনেক সমালােচকের মতে এই উপন্যাসটি বিভূতিভূষণের আত্মজীবনী মূলক উপন্যাস ।

✅ আদর্শ হিন্দু হােটেল : রানাঘাটের একটি হােটেলকে কেন্দ্র করে কাহিনি আবর্তিত । ১৯৪০ খ্রি : প্রকাশিত হয় । পদ্ম ও হাজারি ঠাকুর উল্লেখযােগ্য চরিত্র । এই উপন্যাসটি উৎসর্গ করা হয়েছে শ্রীমান নুটুবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায়কে ।

✅ বিপিনের সংসার : বিবাহিত জীবনের ছবি এতে ধরা পড়েছে । প্রকাশকাল- ১৯৪১ খ্রি :। চরিত্র — বিপিন , মানী ও শান্তি । বিপিন চরিত্রে ভণ্ডামি ও তার দুই বিবাহিত স্ত্রীর চরিত্রের মনস্তাত্বিক উত্থান পত্তনের কাহিনী এই উপন্যাস ।

✅ দুই বাড়ি : অভাব , দৈনতা , প্রেম এখানে আলােচিত । মােক্তার নিধিরামের আখ্যান । চরিত্র – নিধিরাম , মঞ্জী , হৈম । উৎসর্গ করা হয়েছে কল্যাণীয়া বধূমাতাকে।


✅ দেবযান : বিভূতিভূষণের আধ্যাত্মিকতার পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটেছে এই উপন্যাসে । প্রকাশ -১৯৪৪ । প্রায় ৫ বছর ধরে এটি রচনা করেন । অলৌকিকতা ও গ্রাম্যতার এক নিবিড় যােগসূত্র রচনা হয়েছে এই উপন্যাসে । ) মানব আত্মার বিভিন্ন অবস্থানের উপর ভিত্তি করে রচিত এই উপন্যাসটি উৎসর্গ করা হয়েছে শ্রীযুক্ত ষােড়শীকান্ত চট্টোপাধ্যায় মহাশয়কে ।


✅ অনুবর্তন : লেখকের শিক্ষা জীবনের অভিজ্ঞতা এতে দেখা যায় । প্রকশ : -১৯৪১ এটি একটি রােমাঞ্চ – রহস্য ধর্মী রচনা ।

✅ কেদাররাজা : নাটকীয়তা ও অলৌকিকতা এখানে দেখানাে হয়েছে । প্রকাশ- ১৯৪৫

✅ ইছামতী : – ইছামতীর তীরে জনজীবন এবং ইতিহাস এই উপন্যাসের মূল বিষয়বস্তু । প্রকাশ – ১৯৫০ খ্রি : ।দীনবন্ধুর নীলদর্পণ এর ছায়া এতে দেখা যায় । ইছামতীর টুলু বাংলা সাহিত্যে শিশু চরিত্র সৃষ্টির এক অভিনব প্রয়াস । জনজীবনে প্রবাহমানতার প্রতীক হল ইছামতী । জীবনানন্দের রুপসী বাংলার ছবি এই উপন্যাসে কোনাে কোনাে জায়গায় খুঁজে পাওয়া যায় । এটি লেখকের শেষ উপন্যাস । ইছামতী লেখককে মরণােত্তর রবীন্দ্র পুরস্কার এনে দেয় ।


✅ অশনি সংকেত : দ্বন্ধ সংঘাতময় জীবনের ছবি এতে ফুটে উঠেছে । প্রকাশ- ১৯৫১ । লেখকের মৃত্যুর পরে প্রকাশিত উপন্যাস এটি ।

💠 কথাসাহিত্যিক বিভূতিভূষণের ছােটো গল্পগ্রন্থ গুলি হল –

✅ মেঘমল্লার ( ১৯৩১ )
✅ মৌরী ফুল ( ১৯৩২ )
✅ যাত্রাবদল ( ১৯৩৪ )
✅ জন্ম ও মৃত্যু ( ১৯৩৭ )
✅ কিন্নরদল ( ১৯৩৮ )
✅ বেণীগরি ফুলবাড়ি ( ১৯৪১ )
✅ নবাগত ( ১৯৪৪ )
✅ তালনবমী ( ১৯৪৪ )
✅ বিধু মাষ্টার ( ১৯৪৫ )
✅ অসাধারণ ( ১৯৪৬ )


✅ লেখকের প্রথম গল্পগ্রন্থ “ মেঘমল্লার ” এর প্রতিনিধি স্থানীয় গল্প হল – পুঁইমাচা । এটি প্রকাশিত হয় প্রবাসী পত্রিকায় ।

✅ যাত্রাবদল গল্পগ্রন্থের একটি উল্লেখযােগ্য গল্প হল – “ভন্ডুল মামার বাড়ি”।

💠 লেখকের গল্পের সংখ্যা প্রায় দুশাের বেশি । তাঁর কিছু বিখ্যাত গল্পের নাম হল –
✅ “ পুইমাচা ‘ ,
✅ ‘ খুটিদেবতা ‘ ,
✅ ‘ নাস্তিক ‘ ,
✅ ‘ মেঘমল্লার ‘ ,
✅ ‘ মৌরিফুল ‘ ,
✅ ‘ ভন্ডুল মামার বাড়ি ‘ ,
✅ ‘ কুয়াশার রং ‘ ,
✅ ‘তারকনাথ তান্ত্রিকের গল্প ‘ ,
✅ ‘তিরােলের বালা ‘ ,
✅ ‘নবাগত ‘ ,
✅ ‘ক্যানভাসার কৃষ্ণলাল ‘ ,
✅ ‘ বুধীর বাড়ী ফেরা ‘ ,
✅’ বিপদ ‘ ,
✅ ‘গল্প নয় ‘ ,
✅ ‘পৈতৃক ভিটা ‘ ,
✅ ‘পিদিমের নিচে ‘ ,
✅ ‘ ঝগড়া ‘ ,
✅ ‘ গ্রহের ফের ‘ ,
✅ দেবতার স্বর্গ ‘ ,
✅ ‘মুড়িঘাটের মেলা ‘ ,
✅ ‘গিরিবালা ‘ ,
✅ ‘ একটি দিন ‘ ,
✅ কয়লা ভাটা ‘ ,
✅ ‘ডানপিটে ‘ ,
✅ ‘যাত্রাবদল ‘ ,
✅ ‘আমার ছাত্র ’ ,
✅ দাতার স্বর্গ ‘ ,
✅ ‘ শেষ লেখা’ ,
✅ ‘প্রত্যাবর্তন আহ্বান ‘ ,
✅ ‘ বউ চন্ডীর মাঠ ‘ ,
✅ ‘ অসাধারণ ‘ প্রভৃতি ।


💠 ডায়েরী বা দিনলিপি :

✅ স্মৃতির রেখা -১৯৪১
✅ তৃণাঙ্কুর -১৯৪৩
✅ উর্মিমুখর -১৯৪৪
✅ উৎকর্ণ -১৯৪৬
✅ হে অরণ্য কথা কও -১৯৪৮

💠 ভ্রমণ কাহিনী :
✅ অভিযাত্রী -১৯৪১
✅ বনে পাহাড়ে -১৯৪৫


💠 পরিশেষে বলা যায় – প্রকৃতিপ্রীতি হল বিভূতিভূষণের রচনার প্রধান বৈশিষ্ট্য । প্রকৃতি বর্ণনার পাশাপাশি শৈশব চিত্র , আধ্যাত্মিকতা ও বাস্তবতার চিত্র তাঁর রচনায় সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে । কবিত্বপূর্ণ বর্ণনা দেখা যায় “আরণ্যক” উপন্যাসে । তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি বাঙালি জীবনের যথার্থ এপিক পথের পাঁচালী । তাঁর ছােটগল্পে ফুটে উঠেছে প্রকৃতি প্রেম , আধ্যাত্ম অনুভুতি , মানব প্রেম । তার রচনায় গীতিকাব্যিক মাধুর্য তাকে বাংলা কথাসাহিত্যিকদের থেকে আলাদা করেছে । এখানেই তার সার্থকতা ।

Related posts:

তোত্তে- চানের আডভেঞ্চার - তেৎসুকো কুরোয়ানাগি
লিঙ্গ : পুংলিঙ্গ , স্ত্রীলিঙ্গ এবং ক্লীবলিঙ্গ ।
ভাষা শিক্ষণের নৈপুণ্যতা
আদর্শ বলা / আদর্শ কথন
স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির সঠিক উচ্চারণ
যুক্তবর্ণের উচ্চারণ : উষ্ট্র , রাষ্ট্র , ট্রেন , চিত্ত , বিত্ত , মত্ত , যুক্ত , রক্ত , শক্ত, যত্ন , ...
যুক্তবর্ণের উচ্চারণ : দ্বন্দ্ব , বিদ্বান , বিদ্বেষ , বদ্ধ , উদ্ধার
অনুলিখন vs শ্রুতিলিখন
কীভাবে শ্রুতিলিখন শ্রেণিকক্ষে শেখানাে যায় ?
বলা , পড়া ও লেখার ক্ষেত্রে যতিচিহ্নের যথাযথ ব্যবহার রীতি
বাংলা ব্যাকরণের কিছু প্রশ্নোত্তর
বলা , পড়া ও লেখার ক্ষেত্রে যতিচিহ্নের যথাযথ ব্যবহার রীতি
কীভাবে শ্রুতিলিখন শ্রেণিকক্ষে শেখানাে যায় ?
অনুলিখন vs শ্রুতিলিখন
কীভাবে হাতের লেখা শেখানাে হবে
ভালাে হস্তাক্ষরের বৈশিষ্ট্য
হাতের লেখা অনুশীলনের উদ্দেশ্য
স্বরধ্বনি ও ব্যঞ্জনধ্বনির সঠিক উচ্চারণ
ভালাে কথাবার্তা শেখানাের কৌশল
আদর্শ বলা / আদর্শ কথন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page