বিদ্যালয় স্তরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ

📚 বিদ্যালয় স্তরে রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যসমূহ ( Aims and Objectives of Teaching Political Science in School level )

🧾 লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য শব্দ দুটি প্রায়ই সমঅর্থে ব্যবহৃত হলেও সকল সময় ও পরিস্থিতিতে তা সমান হয় না । রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষক এই সকল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে এমনভাবে ব্যবহার করবেন যাতে তিনি দেশের জন্য আদর্শ নাগরিক প্রস্তুত করে রাষ্ট্রের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে পারেন ।

📜 রাষ্ট্রবিজ্ঞান । কিছু গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য নিম্নে বর্ণিত হল—

📑 1. সুনাগরিক : রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য হল শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুনাগরিকতার গুণাবলির বিকাশ ঘটিয়ে আদর্শ নাগরিক প্রস্তুত করা ।

📚 সুনাগরিকের গুণগত বৈশিষ্ট্যাবলি ( Characteristics of a good citizen ) : একজন সুনাগরিক—

🔘 সকল মানুষের জন্য সুযােগের সমতায় বিশ্বাস করে ।

🔘 আমাদের সংবিধান কর্তৃক নিশ্চিত মৌলিক মানবাধিকার এবং বিশেষাধিকারের প্রতি সম্মান এবং শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে ।

🔘 আইন এবং তার বিভিন্ন সংস্থার প্রতি সম্মান এবং সমর্থন জ্ঞাপন করে ।

🔘 গণতান্ত্রিক মূলনীতিগুলিকে উপলব্ধি এবং গ্রহণ করে ।

🔘 আত্মকল্যাণের আগে সাধারণ কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয় ।

🔘 স্বাধীনভাবে ভােটাধিকার প্রদান করে ।

🔘 মৌলিক দায়িত্বাবলি সুষ্ঠুভাবে পালন করে ।

🔘 গণতন্ত্রের সঙ্গে শিক্ষার সংযােগের প্রয়ােজনীয়তা উপলদ্ধি করে ।

🔘 অপরের সংস্কৃতি এবং জীবনযাত্রার প্রকৃতিকে সম্মান করে ।

🔘 যুদ্ধ প্রতিরােধের সকল প্রকার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে ।

🔘 অপর দেশের আধিপত্য এবং আগ্রাসন থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করতে সদা প্রস্তুত থাকবে ।

🔘 নিজ সংস্কৃতির উচ্চ মূল্যবােধগুলিকে সসম্মানে গ্রহণ করে ।

🔘 “ বাঁচো এবং বাঁচতে দাও ‘ — এই বাস্তব ধারণার দ্বারা পরিচালিত হয় ।

📑 2. জাতীয় চরিত্রগঠন এবং দেশপ্রেম : কোনাে একটি রাষ্ট্রের অগ্রসরতা , সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের নাগরিকদের স্বাদেশিকতার মমভাবের সঙ্গে জড়িত । এই সকল নাগরিকগণ মাতৃভূমির জন্য সকল কিছু আত্মাহুতিতে সদা প্রস্তুত থাকেন এবং অন্তর থেকে তারা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ও সামাজিক মূল্যবােধের জন্য গর্ব বােধ করেন । তবে এই সকল গুণাবলি একমাত্র রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষকই পারেন শিক্ষার্থীদের অভ্যন্তরে স্থাপন করতে । তিনি মনােবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে জাতীয় চরিত্রের বিকাশসাধন এবং সহযােগিতা , প্রেম , সহানুভূতি , সংবেদনশীলতা প্রভৃতি গুণাবলি সঞ্চারিত করে দেশের অগ্রসরতায় সহায়তা করতে পারেন ।

নাগরিকতা সম্পর্কে লিখতে গিয়ে H H Horne লিখেছেন— ” Citizenship is a man’s place in the states . As the state in one of the permanent institutions of society and as man must ever live in organised relation with his follows citizenship cannot be omitted from the constituency of the educational idea . ” এমনকি গ্রিক দার্শনিকরাও স্বীকার করেছেন যে আদর্শ নাগরিকত্ব হল রাষ্ট্রবিজ্ঞানের প্রধান লক্ষ্য । প্রাচীন গ্রিসের “ Civic Oath ” থেকে এ সম্পর্কে অনেকটা ধারণা পাওয়া যায় । Bining and Bining ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণের লক্ষ্য হিসেবে অনুরূপ কথাই বলেছেন ।

📑 3. গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির উন্নয়ন এবং গণতন্ত্রের বিকশসাধন : শিক্ষার্থীদের নাগরিকত্বের বাস্তব জ্ঞান দান রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণের অন্যতম লক্ষ্য হওয়া উচিত , কারণ এটি তরুণ প্রজন্মের মধ্যে গণতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটায় । সামাজিক ন্যায়বুদ্ধি , বিচারবুদ্ধি , কর্তব্যনিষ্ঠা জাগ্রত করে উদার চিন্তনশক্তির অধিকারী করে ; ধর্মীয় ও জাতিগত কুসংস্কার মুক্ত করে ; গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্যবােধ সৃষ্টি করে গণতন্ত্রের উৎকর্ষসাধনের পথ সুগম করে , যা শেষপর্যন্ত আমাদের গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে ।

📑 4. রাজনৈতিক চেতনা ও সামাজিক দক্ষতা : ‘ Politics ‘ গ্রন্থে অ্যারিস্টটল বলেছিলেন মানুষ হল ‘ রাজনৈতিক জীব । এই রাজনৈতিক জীব বিভিন্নকালে জনসাধারণের মনের উপর ব্যাপকভাবে ক্ষমতা বিস্তার করে রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটিয়েছে এবং এটি সম্ভব হয়েছে একমাত্র রাজনৈতিক সচেতনতার মাধ্যমে । তাই রাজনৈতিক সচেতনতা বৃদ্ধি রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য । এই সচেতনতা শিক্ষার্থীদের সামাজিকভাবে দক্ষ হিসেবে গড়ে তােলে । রাজনৈতিক চেতনা ও সামাজিক দক্ষতা শিক্ষার্থীদের দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাবলি সম্পর্কে সচেতন করে তার সমাধানকল্পে সক্রিয় অংশগ্রহণে উদ্দীপিত করে । এইভাবে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম বিকশিত হয় এবং সহযােগিতা , সহানুভূতি ও স্বদেশপ্রেমের মাধ্যমে দেশের অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করে ।

📑 5. বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশসাধন : বিজ্ঞানের এই যুগে , প্রত্যেকটি বিষয়কে তাদের যথাযথ দৃষ্টিকোণে দেখতে আমাদের প্রত্যেকেরই একটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থাকতে হবে । তাই রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণের একটি অন্যতম লক্ষ্য হল বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশসাধন । এই দৃষ্টিভঙ্গি তরুণ প্রজন্মকে জীবনের অবৈজ্ঞানিক ও অপ্রয়ােজনীয় বিষয় ও ঘটনাবলি থেকে বিরত রাখতে বাস্তববাদী হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করবে ।

📑 6. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংহতির সুদৃঢ়করণ : বর্তমানকালে নানাপ্রকার নেতিবাচক প্রতিবন্ধকতার কারণে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংহতি রক্ষা আজ কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন , তবে বিভিন্ন রাষ্ট্রবিজ্ঞানীদের মতে সঠিকভাবে রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণই একমাত্র পারে দেশের ঐক্য ও একতার ভিত্তি অব্যাহত রাখতে ।

🧾 সাম্প্রতিককালে দ্রুতগতিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে সময় ও স্থানের দূরত্বও ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে । ফলে এমন একটি সময়পর্ব আসবে যখন সমগ্র পৃথিবী হয়ে উঠবে একটি একক এবং কোনাে একটি একক রাষ্ট্রের নাগরিক হবেন সমগ্র বিশ্বের নাগরিক । তবে প্রতিটি রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের মধ্যে এই মানসিকতার বিকাশ তখনই ঘটবে যখন তিনি আন্তর্জাতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উন্নীত হবেন , ‘ Live and Let Live’— নীতির দ্বারা পরিচালিত হবেন । প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এই মানসিকতার বিকাশসাধন সম্ভব একমাত্র রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সঠিক শিক্ষণের মাধ্যমেই । সুতরাং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংহতির সুদৃঢ়করণও রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণের একটি অন্যতম লক্ষ্য ।

📑 7. যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার : বর্তমানকালে অস্পৃশ্যতাবাদ , আঞ্চলিকতাবাদ , জাতীয়তাবাদ , সন্ত্রাসবাদ , জাতিবিদ্বেষ প্রভৃতি অশুভ শক্তিগুলি সমাজের জীবনীশক্তিকে ক্রমশ শুষে নেওয়ার ফলে আমাদের সমাজ আজ অন্ধকারের কঠিন গহ্বরে ক্রমশ নিমজ্জিত হচ্ছে । এরূপ পরিস্থিতিতে একমাত্র রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণই পারে যুক্তিবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার ঘটিয়ে এই সমস্ত অশুভ শক্তিগুলির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানাের উপযুক্ত নাগরিক গড়ে তুলতে এবং সমাজকে পুনরায় পূর্ব মর্যাদার স্থানে উন্নীত করতে ।

📑 8. নেতৃত্বদানের ক্ষমতা বৃদ্ধি : রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে সমাজের বিভিন্ন সমস্যাসমাধান , সমাজ পরিবর্তনে অংশগ্রহণ , বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসারসাধন প্রভৃতি মানসিকতার বিকাশ ঘটিয়ে নেতৃত্বদানের সুপ্ত সম্ভাবনাকে প্রজ্জ্বলিত করে এবং রাষ্ট্রের জন্য ভবিষ্যৎযােগ্য নেতৃত্বকে প্রস্তুত করে তােলে ।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণের মূল্য : ( Values of Teaching Political Science ) :

🧾 রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণ সমাজের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবােধসম্পন্ন । বর্তমান প্রজন্মকে ভবিষ্যতের সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনের জন্য প্রস্তুত করতে এর মূল্য অপরিসীম । রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষণের ক্ষেত্রে নিম্নলিখিত দিকগুলির প্রতি দৃষ্টি রাখা হয়—

🔘 বিভিন্ন কমিশন ও কমিটির রিপাের্টকে অনুসরণ করে বলা যায় রাষ্ট্রবিজ্ঞান শিক্ষার্থীদের চরিত্রগঠনে সহায়তা করে । শিক্ষার্থীদের মধ্যে সহযােগিতা , সহমর্মিতা , সহানুভূতি , দায়িত্বশীলতা প্রভৃতি গুণাবলির বিকাশ ঘটিয়ে সমাজ অগ্রগতির সহায়ক উপযুক্ত ভবিষ্যৎ নাগরিক গড়ে তােলে ।

🔘 বিশ্ব ইতিহাসে খ্যাতনামা বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা , দক্ষ প্রশাসক , রাজনীতিবিদ প্রমুখের জীবনী ও কর্মজীবন সম্পর্কে জ্ঞান প্রদান করে রাষ্ট্রবিজ্ঞান । এই জ্ঞান তাদের ভবিষ্যতে রাষ্ট্র ও সমাজের কান্ডারির ধারক ও বাহক হয়ে উঠতে অনুপ্রাণিত করে ।

🔘 আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক সংগঠন সম্পর্কে ধারণা প্রদান করে আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির বিকাশ ঘটায় ।

🔘 রাষ্ট্রবিজ্ঞান রাষ্ট্রের উদ্ভব , প্রকৃতি , কাঠামাে এবং কার্যাবলি সম্পর্কে তথ্য প্রদান করে , যা আধুনিক মানুষের কাছে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ।

🔘 শিক্ষার্থীদের জাতীয় সংহতি ও ঐক্যবােধে উদ্বুদ্ধ করে তাদের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করে ।

🔘 রাষ্ট্র এবং সমাজের বিভিন্ন প্রকার সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যাসমাধানের ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়ােগের মানসিকতা সৃষ্টি করে ।

🔘 গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভাবধারায় বিশ্বাসী হতে শেখায় ।

🔘 বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠা ও জনকল্যাণসাধনের মানসিকতা গড়ে তােলে ।

Related posts:

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের জীবন কথা
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী : 2024
চন্দ্রযান-3 : চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণকারী প্রথম দেশ ভারত
GENERAL STUDIES : TEST-2
GENERAL STUDIES : 1
কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স: 8ই সেপ্টেম্বর
'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
তপনের জীবনে তার ছোটো মাসির অবদান আলোচনা করো।
সমান্তরাল আলোকরশ্মিগুচ্ছ বলতে কী বোঝ ?
আলোকরশ্মিগুচ্ছ বলতে কী বোঝায় ? এটি কয়প্রকার ও কী কী ?
একটি সাদা কাগজকে কীভাবে তুমি অস্বচ্ছ অথবা ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যমে পরিণত করবে ?
ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
অস্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
স্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
অপ্রভ বস্তুও কি আলোর উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে?
বিন্দু আলোক - উৎস কীভাবে পাওয়া যেতে পারে ?
বিন্দু আলোক - উৎস ও বিস্তৃত আলোক - উৎস কী ?
অপ্রভ বস্তু কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
স্বপ্নভ বস্তু কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
দিনেরবেলা আমরা ঘরের ভিতর সবকিছু দেখতে পাই , কিন্তু রাত্রিবেলা আলোর অনুপস্থিতিতে কোনো জিনিসই দেখতে পা...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page