পৃথিবীর গােলাকৃতির অপ্রত্যক্ষ প্রমাণ

📚 [ খ ] পৃথিবীর গােলাকৃতির অপ্রত্যক্ষ প্রমাণ :

🔲 [ ১ ] পৃথিবীর গােলাকার ছায়া : গােলাকার পদার্থের ছায়াও গােলাকার হয় । চন্দ্রগ্রহণের সময় চাঁদের ওপর পতিত পৃথিবীর ছায়া গােলাকার দেখায় । পৃথিবী গােলাকার বলেই এটা সম্ভব হয় ( ৬ পৃষ্ঠার ৫ নং চিত্র দেখ ) ।

🔲 [ ২ ] পৃথিবীর সর্বত্র একই সময়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয় না : পৃথিবী সমতল হলে পৃথিবীর সর্বত্র একই সময়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হত । কিন্তু পৃথিবী গােলাকার বলে অবস্থান অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে বিভিন্ন স্থানে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত হয় ( ৬ পৃষ্ঠার ৬ নং চিত্র দেখ ) ।

🔲 [ ৩ ] গােলাকার গ্রহ : দূরবীনের সাহায্যে দেখা যায় যে , সব গ্রহই গােলাকার । আমাদের পৃথিবীও একটি গ্রহ , অতএব পৃথিবীর পক্ষে গােলাকার হওয়াই স্বাভাবিক ।

🔲 [ ৪ ] গােলাকার সমুদ্র পৃষ্ঠ : তীরের দিকে আগত কোন জাহাজের মাস্তুল প্রথমে চোখে পড়ে
এবং ক্রমশ তার নীচের অন্যান্য অংশ যেমন ছাদ , পাটাতন ইত্যাদি দেখা যায় । পৃথিবী গােলাকার বলেই এরকম হয় , সমতল হলে পুরাে জাহাজটাই একই সঙ্গে চোখে পড়ত ( চিত্র নং ৭ ) ।

🔲 [ ৫ ] দিগন্ত রেখা : সমুদ্র কিংবা বিশাল প্রান্তরের ধারে দাঁড়িয়ে দূরে তাকালে মনে হয় যে , জলরাশি বা ভূমি এবং আকাশ যেন একটি বৃত্তরেখায় মিশে গিয়েছে । এই রেখাকে দিগন্ত রেখা ( Florion ) বলে । যত ওপর থেকে দেখা যায় দিগন্তরেখার পরিধিও তত বেড়ে যায় । ৮ নং ছবিতে স্তম্ভ থেকে দেখলে দিগন্ত রেখার যে পরিধি দেখা যাবে , বিমান থেকে দেখলে তা আরও অনেক বেড়ে যাবে । পৃথিবীর গােলাকৃতির জন্যেই এরকম হয় ।

🔲 [ ৬ ] বেভ ফোর্ড লেভেল পরীক্ষা : ১৮৭০ সালে এ . আর . ওয়ালেস নামে একজন বিজ্ঞানী ইংল্যাণ্ডের বেডফোর্ড খালে পৃথিবীর গােলাকৃতি পর্যবেক্ষণ করার জন্য একটি পরীক্ষা করেন । তিনি ঐ খালের স্থির জলে ১ কিলােমিটার দূরে দূরে সমান দৈর্ঘ্যের ৩ টি খুঁটি ভেলার সাহায্যে একটি সরলরেখায় এমন ভাবে ভাসিয়ে রাখলেন যাতে খুঁটি তিনটির জলের ওপরের অংশের দৈর্ঘ্য সমান থাকে । এইবার তিনি দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখলেন যে , মাঝের খুঁটিটির মাথা প্রথম ও তৃতীয় খুঁটির তুলনায় সামান্য উঁচু হয়ে রয়েছে । পৃথিবী গােল বলেই মাঝের খুঁটিটির উচ্চতা বেশী বলে মনে হয়েছিল ( ৯ নং চিত্র ) ।

🔲 [ ৭ ] ধ্রুবতারার অবস্থান : রাত্রি বেলায় ধ্রুবতারাকে পৃথিবীর মেরুরেখার উত্তর প্রান্তে সুমেরু বিন্দুর ঠিক মাথার ওপর ( ৯০ ° কোণে ) দেখা যায় । আবার ধ্রুবতারাকে কর্কটক্রান্তি রেখার ওপর ২৩ ½° কোণে এবং বিষুব রেখার ওপর ০ ° কোণে দেখা যায় । দক্ষিণ গােলার্ধে ধ্রুবতারা দেখা যায় না । পৃথিবী সমতল হলে পৃথিবী পৃষ্ঠে অবস্থিত যে কোন জায়গা থেকে ধ্রুবতারাকে একই কোণে দেখা যেত । কিন্তু পৃথিবী গােলাকার হওয়ায় পৃথিবী পৃষ্ঠের কোন স্থান থেকে যতই সুমেরু দিকে এগিয়ে যাওয়া যায় , ধ্রুবতারাকে মাথার ওপর উঠতে দেখা যায় । এইভাবে যেতে যেতে সুমেরু বিন্দুতে গেলে ধ্রুবতারাকে ঠিক মাথার ওপর ৯০ ° কোণে দেখা যায় । পৃথিবীর আকৃতি গােলাকার বলেই এই রকম হয় । পৃথিবী সমতল হলে পৃথিবী পৃষ্ঠের সমস্ত স্থান থেকেই ধ্রুবতারাকে আকাশের এক জায়গাতেই দেখা যেত ।

🔲 [ ৮ ] কোন নির্দিষ্ট স্থান থেকে ভূ – প্রদক্ষিণ করে সেই স্থানেই ফিরে আসা : কুক , ম্যাজেলান , ড্রেক প্রমুখ ভূ – পর্যটকগণ কোন নির্দিষ্ট স্থান থেকে দিক পরিবর্তন না করে জাহাজ চালিয়ে ভূ প্রদক্ষিণ করে একই স্থানে ফিরে এসেছে , পৃথিবী গােলাকার বলেই এটা সম্ভব হয়েছে ।

📚 [ গ ] পৃথিবীর অভিগত গােলাকৃতি :

🔘 অভিগত গােলক কাকে বলে ( What is obate speriod ) ? যে গােলকের উত্তর ও দক্ষিণ দিক সামান্য চাপা এবং পূর্ব – পশ্চিম দিক সামান্য ফোলা তাকে অভিগত গােলক বা উপগােলক বলে ।

🔘 পৃথিবী কি একটি অভিগত গােলক ? বিভিন্ন পরীক্ষা থেকে জানা যায় যে , পৃথিবীর আকার ঠিক গােলাকার নয় , বরং পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরু কিছুটা চাপা এবং মধ্যের নিরক্ষীয় অঞ্চল কিছুটা স্ফীত । সুতরাং বলা যায় যে , পৃথিবীর আকৃতি অনেকটা অভিগত গােলকের মত ।

🔲 পৃথিবীর অভিগত গােলত্বের প্রমাণ : নীচের পরীক্ষাগুলাে প্রমাণ করে যে , পৃথিবী একটি অভিগত গােলক ।

🔘 ( ১ ) পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাস ও মেরুব্যাসের মধ্যে দৈর্ঘ্যের পার্থক্য : পৃথিবীর নিরক্ষীয় ব্যাস ( ১২,৭৫৭ কিলােমিটার ) এবং মেরু ব্যাসের ( ১২,৭১৪ কিলােমিটার ) মধ্যে প্রায় ৪৩ কিলােমিটার পার্থক্য ( ১২,৭৫৭-১২,৭১৪ = ৪৩ ) রয়েছে । পৃথিবী একটি নিখুঁত গােলক হলে দুটি ব্যাস দু’রকম হত না ।

🔘 ( 2 ) আবর্তনের ফলে গােলাকার পৃথিবীর মধ্যভাগ স্ফীত ও মেরু অঞ্চলে সামান্য চাপা হয় : কোন গােলাকৃতি নমনীয় বস্তু যদি নিজের মেরুদণ্ডের ওপর লাটুর মত অনবরত ঘুরতে থাকে ( আবর্তন করে ) তবে তার মধ্যে একই সঙ্গে পরস্পরবিরােধী কেন্দ্রমুখী ( Centripetal ) এবং কেন্দ্ৰবহির্মুখী ( Centrifugal ) শক্তির উদ্ভব হয় , যার প্রভাবে ঐ গােলাকৃতি নমনীয় বস্তু নিজের যে মেরুরেখার চারদিকে আবর্তন করে তার প্রান্তদেশ কিছুটাচাপা হয় এবং মধ্যভাগ কিছুটা স্ফীত হয় । পৃথিবীর আহ্নিকবা আবর্তন গতি পৃথিবীর অভিগত গােলাকৃতির অন্যতম অপ্রত্যক্ষ প্রমাণ ।

🔲 প্রকৃতপক্ষে জন্মকালে পৃথিবী উত্তপ্ত ও নমনীয় অবস্থায় ছিল । ক্রমাগত আবর্তনের ফলে পৃথিবীর মধ্যাংশ বা নিরক্ষীয় অঞ্চলে অতিরিক্ত যে কেন্দ্রবিমুখ শক্তির ( Centrifugal force ) সৃষ্টি হয় তার ফলে পৃথিবীর ঐ অংশ স্ফীত হয়ে ওঠে ( চিত্র ১২ ) ।

🔘 ( ৩ ) নিউটনের মাধ্যাকর্ষণ সূত্রের সাহায্যে পৃথিবীর অভিগত গােলাকৃতির প্রমাণ : নিউটনের মধ্যাকর্ষণ সূত্র অনুসারে , ‘ যে বস্তু পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে যত দূরে অবস্থিত , তার ওপর পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তির প্রভাব তত কম । পৃথিবী পৃষ্ঠের সর্বত্রই অভিকর্ষ শক্তি একরকম নয় । পৃথিবীর আকৃতি যদি গােলাকার হত তবে ভূ – পৃষ্ঠের সর্বত্রই অভিকর্ষ শক্তি একরকম হত । কিন্তু একই বস্তুকে নিরক্ষীয় অঞ্চল এবং মেরু অঞ্চলে ওজন করলে দেখা যায় যে , বস্তুটির মেরু অঞ্চলে যে ওজন হয় নিরক্ষীয় অঞ্চলে তার তুলনায় খানিকটা কম ওজন হয় । এতে প্রমাণিত হয় যে , ভূ – কেন্দ্র থেকে মেরু অঞ্চল কিছুটা কাছে এবং নিরক্ষীয় অঞ্চল কিছুটা দূরে অবস্থিত — অর্থাৎ , মেরু অঞ্চলে পৃথিবী খানিকটা চাপা এবং নিরক্ষীয় অঞ্চলে পৃথিবী খানিকটা ফোলা ।

🔘 গােলীয় পৃথিবীকে আমাদের কাছে সমতল মনে হয় কেন ? একটি বিশাল বৃত্তের পরিধিকে যদি ছােট ছােট ভাগে ভাগ করা যায় , তাহলে ঐ বিশাল পরিধির প্রত্যেকটি ছােট ছােট খণ্ডকে সমতল বলে মনে হয় । একই ভাবে আমরাও ভূ – পৃষ্ঠের অতি সামান্য অংশ দেখতে পাই বলে আমাদের কাছে পৃথিবীকে সমতল বলে মনে হয় ।

📚 [ ঘ ] পৃথিবীর আকৃতি পৃথিবীর মত — এ কথার তাৎপর্য :

🔲 পৃথিবীর জন্মমুহূর্তে ( অর্থাৎ পৃথিবী যখন জ্বলন্ত সূর্য থেকে বিচ্ছিন্ন হল ) পৃথিবীর আকৃতি ছিল গােলাকার । কিন্তু শিশু অবস্থায় ( যখন পৃথিবী উত্তপ্ত ও নমনীয় ছিল ) নিজের অক্ষে ক্রমাগত আবর্তনের ফলে পৃথিবীর মধ্যাংশে যে কেন্দ্রবিমুখ ( Centrifugal ) শক্তির উদ্ভব হল তার ফলে পৃথিবীর মধ্যাংশ অর্থাৎ নিরক্ষীয় অঞ্চল একটু ফুলে উঠে স্ফীত হয় এবং পৃথিবী অভিগত গােলকের আকৃতি প্রাপ্ত হয় ( অর্থাৎ যে গােলকের উত্তর ও দক্ষিণ দিক সামান্য চাপা এবং পূর্ব ও পশ্চিম দিক সামান্য ফোলা ) ।

🔘 কিন্তু পৃথিবীকে যে একটি আদর্শ অভিগত গােলক বলা যায় না তার কারণ : ( ১ ) সমুদ্রতল , পাহাড় – পর্বত এবং মালভূমি ভূ – পৃষ্ঠকেউঁচু নীচু , ঢেউ খেলানাে এবং বন্ধুর রূপ দান করেছে । হিমালয় পর্বতের মাউন্ট এভারেস্ট ( উচ্চতা ৮,৮৪৮ মিটার ) হল পৃথিবীর উচ্চতম অঞ্চল , আর প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর সমুদ্রতলে ৷ অবস্থিত মারিয়ানা খাত ( গভীরতা ১১,০০০ মিটারেরও বেশী ) হল পৃথিবীর নিম্নতম অঞ্চল , অর্থাৎ পৃথিবীর বন্ধুরতার পরিমাণ হল প্রায় ২০ কিলােমিটার —— অর্থাৎ পৃথিবীপৃষ্ঠ যথেষ্ট বন্ধুর ।

( ২ ) পৃথিবী থেকে সম্প্রতি যে সব কৃত্রিম উপগ্রহ ( Satellite ) পাঠানাে হয়েছে তাদের । শ্যেন দৃষ্টিতে ( Remote Sensing ) ধরা পড়েছে যে : [ ক ] পৃথিবীর শুধুমাত্র দক্ষিণ মেরুর দিকই চাপা , উত্তর মেরু চাপা নয় ; [ খ ] দক্ষিণ মেরু ২০ মিটার অতি নীচু এবং উত্তর মেরু ২০ মিটার অতি উঁচু ; [ গ ] দক্ষিণ গােলার্ধের মধ্য অক্ষাংশ ৮ মিটার ফুলে উঠেছে , আর উত্তর গােলার্ধের মধ্য অক্ষাংশ ৮ মিটার বসে গিয়েছে । অর্থাৎ , পৃথিবীর আকৃতি অনেকটা ন্যাসপাতির মত ।

🔲 পৃথিবীর এই বিশিষ্ট আকৃতিটি আমাদের পরিচিত কোন বস্তুর সঙ্গে সঠিকভাবে তুলনীয় নয় , তাই বলা হয় যে , পৃথিবীর আকৃতি পৃথিবীর মতই ( Geoid or Earti Shaped ) ।

Related posts:

বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের জীবন কথা
পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান গুরুত্বপূর্ণ পদাধিকারী : 2024
চন্দ্রযান-3 : চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণকারী প্রথম দেশ ভারত
GENERAL STUDIES : TEST-2
GENERAL STUDIES : 1
কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স: 8ই সেপ্টেম্বর
'জ্ঞানচক্ষু' গল্পের নামকরণের সার্থকতা বিচার করো।
তপনের জীবনে তার ছোটো মাসির অবদান আলোচনা করো।
সমান্তরাল আলোকরশ্মিগুচ্ছ বলতে কী বোঝ ?
আলোকরশ্মিগুচ্ছ বলতে কী বোঝায় ? এটি কয়প্রকার ও কী কী ?
একটি সাদা কাগজকে কীভাবে তুমি অস্বচ্ছ অথবা ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যমে পরিণত করবে ?
ঈষৎ স্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
অস্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
স্বচ্ছ মাধ্যম কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
অপ্রভ বস্তুও কি আলোর উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে?
বিন্দু আলোক - উৎস কীভাবে পাওয়া যেতে পারে ?
বিন্দু আলোক - উৎস ও বিস্তৃত আলোক - উৎস কী ?
অপ্রভ বস্তু কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
স্বপ্নভ বস্তু কাকে বলে ? উদাহরণ দাও ।
দিনেরবেলা আমরা ঘরের ভিতর সবকিছু দেখতে পাই , কিন্তু রাত্রিবেলা আলোর অনুপস্থিতিতে কোনো জিনিসই দেখতে পা...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You cannot copy content of this page